ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রায় সাড়ে ২৩ কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা দুটি গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাযন্ত্র দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। এর মধ্যে একটি লিনিয়ার অ্যাকসিলারেটর এখনো বাক্সবন্দী এবং প্রায় ৮ কোটি ৮৮ লাখ টাকা ব্যয়ে স্থাপিত ক্যাথল্যাব চালু হয়নি। এ ছাড়া চিকিৎসাসামগ্রী কেনাকাটায় তথ্যের গরমিল, সরকারি অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া সরকারি হিসাবে জমা না হওয়া এবং আউটসোর্সিংয়ে জনবল নিয়োগসংক্রান্ত বিভিন্ন অভিযোগের তথ্য পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
সোমবার সকাল ১০টা থেকে শুরু হওয়া দুদকের দুই দিনের অভিযান মঙ্গলবার রাত ৮টায় শেষ হয়। পরে রাত সাড়ে ৮টার দিকে হাসপাতাল প্রাঙ্গণে সংবাদ সম্মেলনে অভিযানের বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরেন দুদকের ফরিদপুর জেলা সমন্বিত কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মোস্তাফিজ। তাঁর নেতৃত্বে দুদকের আট সদস্যের একটি দল এ অভিযান পরিচালনা করে।
দুদক সূত্রে জানা যায়, হাসপাতালটিতে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের হয়রানি, দালাল চক্রের মাধ্যমে বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠানো, আউটসোর্সিংয়ে জনবল নিয়োগ এবং চিকিৎসাসামগ্রী কেনাকাটাসহ বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধান কার্যালয়ের নির্দেশে এ অভিযান চালানো হয়।
অভিযানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে হাসপাতালের ক্যানসার ইউনিটের জন্য প্রায় সাড়ে ১৪ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি লিনিয়ার অ্যাকসিলারেটর কেনা হয়। তবে যন্ত্রটি এখনো বাক্সবন্দী অবস্থায় রয়েছে। একই অর্থবছরে হৃদ্রোগীদের চিকিৎসার জন্য কার্ডিওলজি বিভাগে ৮ কোটি ৮৮ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি ক্যাথল্যাব স্থাপন করা হলেও সেটি চালু হয়নি। দুদকের দাবি, যন্ত্র দুটি চালু না করেই সংশ্লিষ্ট অর্থবছরে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্পূর্ণ বিল পরিশোধ করা হয়েছে।
দুদকের সহকারী পরিচালক মোস্তাফিজ বলেন, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ না করেই লিনিয়ার অ্যাকসিলারেটর কেনা হয়েছে। অন্যদিকে ক্যাথল্যাব চালু না হওয়ায় সরকারি অর্থের অপচয় হয়েছে। এ-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে। অধিকতর যাচাই-বাছাই শেষে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
হাসপাতালের চিকিৎসাসামগ্রী বা এমএসআর কেনাকাটার হিসাবেও অসংগতি পেয়েছে দুদক। অভিযানে ফেব্রিকস নামের একটি ওষুধের ৭৬২ বোতল ঘাটতি পাওয়া গেছে। বিপরীতে হেক্সাটন নামের আরেকটি ওষুধের বোতল বেশি পাওয়া গেছে। দুদক কর্মকর্তা এ ধরনের হিসাবের গরমিলকে অস্বাভাবিক উল্লেখ করে বিষয়টি যাচাইয়ের কথা জানান।
এ ছাড়া হাসপাতালটিতে দীর্ঘদিন ধরে সিটিস্ক্যান ও এক্স-রে পরীক্ষা বন্ধ থাকার বিষয়টিও খতিয়ে দেখেছে দুদক। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এমএসআর কেনার কার্যাদেশে সিটিস্ক্যান ও এক্স-রে ফিল্মসহ বিভিন্ন সামগ্রী অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এসব ফিল্ম সরবরাহ করেনি। তা সত্ত্বেও অন্যান্য সামগ্রীর বিল পরিশোধ করা হয়েছে। এ ঘটনায় কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, তা যাচাই করতে প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংগ্রহ করেছে দুদক।
সরকারি অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া আদায় ও সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার বিষয়েও অনুসন্ধান চালিয়েছে দুদক। সংস্থাটির দাবি, গত এক মাসে হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া বাবদ কোনো অর্থ জমা হয়নি। হাসপাতালটিতে পাঁচটি সরকারি অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে। এর মধ্যে দুটি নষ্ট এবং বাকি তিনটি চালু থাকলেও সেগুলোর ভাড়ার টাকা সরকারি হিসাবে জমা পড়েনি বলে জানিয়েছে দুদক।
এ ছাড়া আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে জনবল নিয়োগসংক্রান্ত নথিপত্রও সংগ্রহ করা হয়েছে। এসব ঘটনায় কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতি হয়েছে কি না, তা নথি যাচাইয়ের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে বলে জানিয়েছেন দুদক কর্মকর্তা।
সহকারী পরিচালক মোস্তাফিজ বলেন, “আমরা প্রতিটি রেকর্ডপত্র সংগ্রহ করেছি। এসব নথি বিশ্লেষণ করে দায় নির্ধারণ করা হবে। এরপর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রধান কমিশনার বরাবর পাঠানো হবে।”
এ বিষয়ে হাসপাতালের উপপরিচালক ও ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মানস কৃষ্ণ কুণ্ডু বলেন, দুদক যেসব তথ্য ও নথিপত্র চেয়েছে, সেগুলো দিয়ে তাঁরা সহযোগিতা করেছেন। দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা দুটি চিকিৎসাযন্ত্রের বিষয়ে মন্ত্রণালয়কেও জানানো হয়েছে।
তবে অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া সরকারি হিসাবে জমা না হওয়ার অভিযোগ সঠিক নয় বলে দাবি করেন তিনি। এমএসআর কেনাকাটায় কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তাঁর জানা নেই বলেও জানান ভারপ্রাপ্ত পরিচালক।
দুদক জানিয়েছে, সংগৃহীত নথিপত্র পর্যালোচনা ও যাচাই-বাছাই শেষে দায় নির্ধারণ করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।