কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে মন্দিরে প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের খয়েরচারা মাতৃ মন্দিরে এই ঘটনা ঘটে।
বৃহস্পতিবার রাত ২ টার দিকে মন্দির পাহারা শেষ করে বাড়ি ফিরে শুক্রবার (৯ অক্টোবর) সকালে মন্দিরে গিয়ে কয়েকটি প্রতিমা ভাঙা অবস্থায় দেখতে পান মন্দির কমিটির সদস্যরা। এই ঘটনার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছায় কুমারখালী থানা পুলিশ। এ ছাড়া কুষ্টিয়া-৪ আসনের সংসদ সদস্য, বিএনপির নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
মন্দিরসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, বৃহস্পতিবার রাতের কোনো একভাগে মন্দিরে প্রতিমা ভাঙচুর করা হয়। মন্দিরের প্রতিমাগুলোর মধ্যে লক্ষ্মীর মাথা ভেঙে ফেলা হয়েছে এবং গণেশ, ওসুর ও সিংহের মুখমণ্ডলের অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে দুর্গা প্রতিমাসহ অন্য প্রতিমাগুলো অক্ষত রয়েছে।
মন্দিরের সাধারণ সম্পাদক কৌশিক বিশ্বাস বলেন, রাত ২টার দিকে মন্দির থেকে চলে গিয়ে পরদিন সকাল ৬টার দিকে এসে মন্দিরের বেড়া ভাঙা ও প্রতিমা ভাঙা অবস্থায় দেখতে পান। রাতে কে বা কারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে তা তারা দেখতে পায়নি। আর্থিক সংকটের কারণে মন্দিরে সিসি ক্যামেরার ব্যবস্থা নেই।
তিনি আরও বলেন, ইতিপূর্বে কমিটি নিয়ে একটা সমস্যা ছিল। এটার কারণে কোন সমস্যা হবে বলে মনে করেন না তিনি।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ কুষ্টিয়া জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট জয়দেব বিশ্বাস বলেন, খয়েরচারা মাতৃ মন্দিরের প্রতিমা ভাঙার ঘটনা ঘটেছে। মন্দিরের প্রতিমার মধ্যে লক্ষ্মীর মাথা ভেঙে ফেলা হয়েছে এবং পাশের আরেকটি প্রতিমার হাতের অংশ ও সিংহের মুখমণ্ডলের সামান্য অংশ ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে। তবে অন্য প্রতিমাগুলো অক্ষত রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, মন্দিরের কমিটি নিয়ে দুটি পক্ষের মধ্যে বিরোধ থাকলেও আলোচনা করে একসঙ্গে পূজা উদযাপনের বিষয়ে সমঝোতার কাছাকাছি পৌঁছেছিলেন তাঁরা। এর মধ্যেই এ ঘটনা ঘটেছে। তবে এটিকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট, পূজায় বাধা সৃষ্টি কিংবা সরকারকে অস্থিতিশীল করার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে ঘটানো হয়েছে এমনটা মনে হয়নি তাঁদের । মন্দিরটিতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা রয়েছে এবং এলাকার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ববোধের বন্ধন সুদৃঢ় বলেও জানান তিনি। ঘটনাটি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনকে অনুরোধ জানিয়েছি তিনি।
কুষ্টিয়া-৪ (কুমারখালী-খোকসা) আসনের সংসদ সদস্য আফজাল হোসেন ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে বলেন, কুমারখালীতে হিন্দু-মুসলিম সবাই ভাই ভাই হিসেবে একসঙ্গে বসবাস করে আসছে। এই অঞ্চলে এর আগে এ ধরনের ঘটনা ঘটেনি। তিনি ৫ আগস্টের পর মোটরসাইকেল নিয়ে সারারাত বিভিন্ন মন্দির পাহারা দিয়েছেন। যার যার ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করবে, কারও ধর্মে আঘাত করা ইসলাম সমর্থন করে না। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় এনে শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এবিষয়ে কুমারখালী উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক লুৎফর রহমান বলেন, দুই-তিন দিন আগে উপজেলায় পূজা উদযাপন কমিটির নেতৃবৃন্দের সাথে অনুষ্ঠিত এক আলোচনায় প্রতিটি পূজামণ্ডপে সিসিটিভি ক্যামেরা বসানোর ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। কিন্তু এই মন্দিরে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়নি। এ ঘটনায় কুমারখালী থানা বিএনপি, পৌর বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের পক্ষ থেকে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, একটি গোষ্ঠী বর্তমান সরকারকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করছে । যেসব প্রতিমা ভাঙচুর করা হয়েছে, তাতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিতর্ক সৃষ্টি করার চেষ্টা থাকতে পারে বলে মনে করেন তারা। এই অঞ্চলে পাকিস্তান আমল থেকেই দুর্গাপূজাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব শান্তিপূর্ণভাবে উদযাপিত হয়ে আসছে। এখানে দীর্ঘদিন ধরে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পরিবেশ বজায় রয়েছে, এই সম্প্রীতি অটুট থাকুক। যারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত, তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
কুমারখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জামাল উদ্দিন জানান, সকালে মন্দিরে প্রতিমা ভাঙার খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় এবং কয়েকটি প্রতিমা ভাঙা অবস্থায় দেখতে পায়। ধারণা করা হচ্ছে, রাতের কোনো এক সময়ে প্রতিমাগুলো ভাঙা হয়েছে। মন্দির কমিটির সাথে কথা বলে এ বিষয়ে স্পষ্ট কিছু জানা যায়নি। তাছাড়া মন্দিরের সিসিটিভি ক্যামেরাগুলো খুলে রাখা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, মন্দির কমিটি নিয়ে অভ্যন্তরীণ বিরোধ চলে আসছে। প্রতিমা ভাঙচুরের সঙ্গে কমিটির দ্বন্দ্বের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে, তা তদন্ত করে দেখে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানানো হয়।