মাধবদীর সড়কের বেহাল দশা, দুই বছরেও নেই স্থায়ী সমাধান
টেন্ডার ও রাজস্ব আদায় চললেও নাগরিক দুর্ভোগ কমছে না, প্রশ্ন জনমনে
আর এ লায়ন সরকার, নরসিংদী।
দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও বাণিজ্যিক এলাকা নরসিংদীর মাধবদী। কাপড়ের ব্যবসাকে কেন্দ্র করে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ব্যবসায়ী, ক্রেতা ও সাধারণ মানুষের সমাগম ঘটে এ শহরে। অথচ গুরুত্বপূর্ণ এই পৌরশহরের বিভিন্ন সড়কের বেহাল দশা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ভোগান্তিতে রয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পথচারীরা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে মাধবদীর বিভিন্ন সড়কের সংস্কার ও উন্নয়নকাজ নিয়ে প্রত্যাশিত অগ্রগতি নেই। কোথাও সৃষ্টি হয়েছে বড় বড় গর্ত, কোথাও সড়কের পিচ উঠে গেছে, আবার কোথাও ভাঙাচোরা ও উঁচু-নিচু সড়কে যানবাহন চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সামান্য বৃষ্টি হলে অনেক স্থানে পানি জমে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়।
এ অবস্থায় প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। বিশেষ করে ব্যস্ত বাজার ও শিল্পাঞ্চলসংলগ্ন সড়কগুলোতে যানবাহনের চাপ বেশি থাকায় দুর্ভোগও বাড়ছে।
টেন্ডার ও রাজস্ব আদায়, তবু সড়কের এই দশা কেন?
মাধবদী পৌরসভায় বিভিন্ন উন্নয়নকাজের টেন্ডার প্রক্রিয়া চলমান থাকার পাশাপাশি বিভিন্ন খাতে পৌরসভার রাজস্ব আদায় করা হচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, যানবাহন থেকে নির্ধারিত টোল, পৌরকরসহ বিভিন্ন খাতে অর্থ আদায় হলেও সেই অর্থের যথাযথ প্রতিফলন সড়ক অবকাঠামোয় দেখা যাচ্ছে না।
তাদের প্রশ্ন, পৌরসভার আয় ও উন্নয়নকাজের টেন্ডার থাকলে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো সংস্কারের বাইরে থাকছে কেন?
তবে পৌরসভার প্রকৃত রাজস্ব আয়, সড়ক উন্নয়নে বরাদ্দ, চলমান প্রকল্পের সংখ্যা, টেন্ডারকৃত কাজের অগ্রগতি এবং ব্যয়ের হিসাব যাচাই করা জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
শিল্প-বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্রে এমন দুর্ভোগ
মাধবদী শুধু একটি পৌরশহর নয়, এটি নরসিংদীর অন্যতম প্রধান শিল্প ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র। বিশেষ করে কাপড়ের ব্যবসার জন্য মাধবদীর রয়েছে দেশজুড়ে পরিচিতি। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ পণ্য পরিবহন ও কেনাবেচা হয় এ এলাকায়।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে পণ্য পরিবহন, যানবাহন চলাচল ও ক্রেতাদের যাতায়াতে সমস্যা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে সড়ক সংস্কার না হওয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বাভাবিক পরিবেশও ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ তাঁদের।
স্থানীয় একাধিক বাসিন্দার ভাষ্য, মাধবদীর মতো গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলের সড়কে প্রবেশ করলে অনেক জায়গায় মনে হয়, এটি যেন দীর্ঘদিন অবহেলায় পড়ে থাকা কোনো শহর।
প্রশাসকের দায়িত্বে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা
মাধবদী পৌরসভার প্রশাসকের দায়িত্বে রয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসমা জাহান সরকার। ফলে পৌরসভার নাগরিক সেবা ও উন্নয়ন কার্যক্রম নিয়ে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশাও রয়েছে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, একজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা একই সঙ্গে পৌর প্রশাসনের দায়িত্বে থাকার পরও কেন দীর্ঘ সময় ধরে সড়কের এমন বেহাল দশা কাটছে না?
তাদের দাবি, পৌরসভার কোন সড়কগুলো সংস্কারের জন্য অগ্রাধিকার পেয়েছে, কোন প্রকল্পে কত টাকা বরাদ্দ হয়েছে, কোন কাজের টেন্ডার হয়েছে এবং কোন কাজ বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে—এসব তথ্য জনসম্মুখে প্রকাশ করা হোক।
দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে
সড়কের গর্ত ও ভাঙাচোরা অংশের কারণে মোটরসাইকেল, অটোরিকশা, ইজিবাইকসহ বিভিন্ন যানবাহন চলাচলে ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। রাতের বেলায় অনেক সড়কে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সড়কের দুরবস্থার কারণে ছোটখাটো দুর্ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। যদিও এসব দুর্ঘটনার সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পাওয়া যায়নি।
জবাবদিহি চান নাগরিকরা
মাধবদীর নাগরিকদের দাবি, তাঁরা শুধু নতুন প্রকল্পের ঘোষণা বা টেন্ডার নয়, বাস্তবে চলাচলযোগ্য ও নিরাপদ সড়ক চান।
তাঁদের প্রশ্ন—দুই বছরের বেশি সময় ধরে যেসব সড়ক বেহাল অবস্থায় রয়েছে, সেগুলোর সংস্কার কবে হবে? বরাদ্দ থাকলে কাজ বাস্তবায়নে বিলম্বের কারণ কী? আর টেন্ডার হয়ে থাকলে কাজ শেষ না হওয়ার কারণই বা কী?
এ ছাড়া পৌরসভার রাজস্ব আয় ও উন্নয়ন ব্যয়ের হিসাব প্রকাশেরও দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
প্রশাসনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে মাধবদী পৌরসভার প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসমা জাহান সরকারের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তিনি ফোন রিসিভ না করায় তাঁর বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
মাধবদীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোর বেহাল দশা নিয়ে নাগরিকদের দীর্ঘদিনের এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে এখন প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ এবং উন্নয়নকাজের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। শিল্প ও বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই পৌরশহরের সড়ক যোগাযোগ কবে স্বাভাবিক হবে—সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছেন মাধবদীর বাসিন্দারা।