ঢাকার সাভারের আশুলিয়ার জামগড়া এলাকায় প্রীতি গ্রুপের ‘এস সূহী ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে’ গ্যাস সিলিন্ডারবাহী লরিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে আটজনে দাঁড়িয়েছে। রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় ঘটনাস্থলে পাঁচজন এবং পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (ঢামেক) বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও তিনজনের মৃত্যু হয়। সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) ঢামেক হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই সেলিম সর্বশেষ মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেন।
ফায়ার সার্ভিস ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে জানা গেছে, রোববার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা থেকে পৌনে ৭টার মধ্যে কারখানা প্রাঙ্গণে সারিবদ্ধভাবে রাখা সিলিন্ডারবাহী লরিগুলোর মধ্যে একটি কাভার্ড ভ্যান থেকে গ্যাস সিলিন্ডার আনলোড করার সময় প্রথম বিস্ফোরণ ঘটে। এরপর পরপর একাধিক বিস্ফোরণে পুরো এলাকা কেঁপে ওঠে এবং আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। আগুনের শিখা কয়েক কিলোমিটার দূর থেকেও দেখা গেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
জিরাবো মডার্ন ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র স্টেশন অফিসার শাহাবুদ্দিন জানান, কারখানাটিতে তিতাস গ্যাসের সংযোগ থাকলেও পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় বিকল্প হিসেবে সিলিন্ডারবাহী লরি থেকে গ্যাস সরবরাহ নেওয়া হতো। ফায়ার সার্ভিসের প্রাথমিক ধারণা, সিলিন্ডারের ভেতরে অতিরিক্ত চাপ বা প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণেই বিস্ফোরণের সূত্রপাত হতে পারে। ডিইপিজেড ফায়ার সার্ভিসের ওয়্যারহাউস ইন্সপেক্টর সোমেন বড়ুয়া জানান, বড় কাভার্ড ভ্যান থেকে গ্যাসভর্তি সিলিন্ডার নামানোর সময়ই দুর্ঘটনাটি ঘটে। কারখানার একজন পরিদর্শক রাকিব হোসেন জানান, কাজ শেষ হওয়ার আগমুহূর্তে গ্যাস লিকেজের শব্দ পাওয়া যায়, এর কিছুক্ষণ পরই বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে।
বিস্ফোরণের তীব্রতায় কাভার্ড ভ্যানের ওপরের অংশ ও সিলিন্ডারের খণ্ডাংশ চারদিকে ছিটকে পড়ে। একটি সিলিন্ডারের অংশ পার্শ্ববর্তী দর্জির দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা পথচারী মোছাম্মত জয়নব বেগমের (৫৫) গায়ে আঘাত করলে তিনি ঘটনাস্থলেই মারা যান। লরির ভেতর, নিচে ও পাশ থেকে আরও পাঁচজনের দগ্ধ মরদেহ উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিস। বিস্ফোরণের আঘাতে আশপাশের কয়েকটি ভবনের কাচও ভেঙে পড়ে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। পার্শ্ববর্তী ভবনের মালিক ফারজানা সুলতানা জানান, বিস্ফোরণে তাঁদের বাড়ির থাই গ্লাস ভেঙে গেছে।
জিরাবো ও ডিইপিজেড ফায়ার সার্ভিসের ছয়টি ইউনিট প্রায় দুই ঘণ্টার চেষ্টায় রাত পৌনে ৯টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে, এরপর শুরু হয় ধ্বংসস্তূপ সরানো ও উদ্ধার কাজ। দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ৪০ জন, যাদের মধ্যে আছেন আনসার সদস্য, কারখানার শ্রমিক ও পথচারী। আশুলিয়ার নারী ও শিশু হাসপাতালের সিনিয়র ম্যানেজার হারুন অর রশিদ জানান, ঘটনার পরপরই তাঁদের হাসপাতালে অন্তত ১৬ জন আহত রোগী আসেন, এর মধ্যে সুজন মিয়া (৩৫), নজরুল ইসলাম (৩৫) ও নূর ইসলামের (৪০) অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাঁদের ঢামেক হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে পাঠানো হয়; পরে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁদের মধ্যে দুজনের মৃত্যু হয়।
এ দুর্ঘটনায় কারখানা প্রাঙ্গণে থাকা প্রায় আট থেকে নয়টি লরি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঘটনার জেরে সোমবার এস সূহী ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের আওতাধীন চারটি পোশাক কারখানা — প্রীতি কম্পোজিট টেক্সটাইল লিমিটেড, প্রীতি কম্পোজিট গার্মেন্টস লিমিটেড, অক্সফোর্ড কালারস লিমিটেড ও এস সূহী ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক লিমিটেড — বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং দুর্ঘটনাস্থল ঘিরে উৎসুক জনতার ভিড় সামলাতে কাজ করছেন ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ সদস্যরা।
আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তরিকুল ইসলাম বলেন, নিহতদের পরিচয় শনাক্ত ও আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার কাজ চলছে। এদিকে শিল্প পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া জানিয়েছিলেন, দুর্ঘটনার পর মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছিল, যা পরে সত্যি প্রমাণিত হয়। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ ও দায় নির্ধারণে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।