বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬
হোম অপরাধ অর্থনীতি আইন-আদালত আন্তর্জাতিক খেলাধুলা গণমাধ্যম জাতীয় বিজ্ঞান-প্রযুক্তি বিনোদন রাজনীতি শিক্ষা সারাবাংলা

সিন্ডিকেটের ‘খুঁটির জোর’ ও কোটি টাকার খেলা: মামলা হলেও কেন অধরা গয়ালমারার সোনা মিয়ারা?

মো গিয়াস উদ্দীন
বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:২২ pm
৭৯
সিন্ডিকেটের ‘খুঁটির জোর’ ও কোটি টাকার খেলা: মামলা হলেও কেন অধরা গয়ালমারার সোনা মিয়ারা?
সারের জন্য হাহাকার বৃষ্টির মাঝেও দীর্ঘ লাইন কৃষকদের

কক্সবাজারের উখিয়া সীমান্ত দিয়ে মিয়ানমারে সরকারি ভর্তুকির সার পাচারের এক এলাহী কাণ্ড উন্মোচিত হয়েছে। এই আন্তর্জাতিক চোরাচালান চক্রের অন্যতম মূল হোতা হিসেবে বারবার সামনে এসেছে গয়ালমারা এলাকার বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব সোনা মিয়াসহ কয়েকজন ব্যক্তির নাম ।

তাদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক মামলা থাকলেও রহস্যজনকভাবে তারা এখনো রয়ে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। কোটি টাকার আর্থিক মুনাফা, দুর্গম সীমান্ত এবং স্থানীয় সিন্ডিকেটের শক্তিশালী নেটওয়ার্কই তাদেরকে ‘অধরা’ করে রেখেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

দুর্গম সীমান্ত ও আত্মগোপনের স্বর্গরাজ্য

স্থানীয় ও সীমান্ত সূত্র জানায়, উখিয়ার গয়ালমারা এবং পালংখালী সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো ভৌগোলিকভাবে অত্যন্ত দুর্গম। নাফ নদী এবং পাহাড়বেষ্টিত এই সীমান্ত পথগুলো অপরাধীদের জন্য পলায়নের মোক্ষম রুট।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কোনো অভিযানের প্রস্তুতি এখনো পর্যন্ত দৃশ্যমান নয় তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের তথ্য অনুযায়ী, এটি কেবল সাধারণ সার পাচার নয়, বরং একটি ভয়াবহ আন্তঃসীমান্ত অপরাধচক্র। বাংলাদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকির সার চোরাই পথে যাচ্ছে মিয়ানমারে। আর তার বিনিময়ে ওপার থেকে বাংলাদেশে ঢুকছে মরণনেশা ইয়াবা ও অবৈধ মারণাস্ত্র।

মুনাফার অংক যেখানে আকাশচুম্বী!

সোনা মিয়াদের মতো পাচারকারীদের এই ব্যবসার পেছনে রয়েছে অবিশ্বাস্য আর্থিক লাভ। স্থানীয়দের হিসাব ও প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, এই চক্রের লভ্যাংশের চিত্রটি চমকে ওঠার মতো:

ক্রয়মূল্য: সরকারি ভর্তুকির প্রতি বস্তা সার কেনা হয় ১,০৬০ থেকে ১,১০০ টাকায়।

বিক্রয়মূল্য: সীমান্ত পার করে মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কাছে প্রতি বস্তা বিক্রি হয় প্রায় ৯,০০০ টাকায়!

খরচের হিসাব: প্রতি ১০০ বস্তা সারে গাড়ি ভাড়া, লেবার খরচ, রাজনৈতিক নেতা, স্থানীয় কিছু মিডিয়া ও প্রশাসন ম্যানেজের পেছনে খরচ হয় ৬০,০০০ টাকার মত সব মিলিয়ে আনুমানিক ২ লাখ ২০ হাজার টাকা।

নিট লাভ: খরচ বাদ দিয়ে প্রতি ১০০ বস্তা সার পাচারে এই চক্রের পকেটে ঢুকছে প্রায় ৬ লক্ষ ৮০ হাজার থেকে ৭ লক্ষ টাকা!

এই বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থই সোনা মিয়াদের মূল চালিকাশক্তি, যা দিয়ে সে প্রশাসন ও প্রভাবশালীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে বহাল তবিয়তে রাজত্ব চালাচ্ছে। এই সার মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো বিস্ফোরক তৈরির কাঁচামাল হিসেবেও ব্যবহার করছে বলে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।

ডিলার সিন্ডিকেট ও নজরদারির ঘাটতি

অনুসন্ধানে জানা যায়, সোনা মিয়ার খুঁটির জোর মূলত স্থানীয় কিছু অসাধু সার ডিলার ও খুচরা বিক্রেতা। সরকারিভাবে কৃষকদের জন্য বরাদ্দকৃত সার তারা বেশি লাভের আশায় কালোবাজারে সোনা মিয়ার সিন্ডিকেটের হাতে তুলে দেয়।

স্থানীয় পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের জনপ্রতিনিধিদের ভাষ্যমতে, উখিয়া-টেকনাফ থেকে বের হওয়ার সময় চেকপোস্টগুলোতে কড়া তল্লাশি থাকলেও, সীমান্ত এলাকায় যখন মালবাহী যানবাহন ঢোকে, তখন নজরদারিতে এক ধরণের শিথিলতা বা ঘাটতি দেখা যায়। এই ফাঁকফোকরকে কাজে লাগিয়েই সোনা মিয়াদের মত পাচারকারী বাইরে থেকে সার এনে সীমান্তে মজুত করে এবং রাতের অন্ধকারে ওপারে পাচার করে দেয়।

এখনো কেন অধরা?

বর্তমানে বিজিবি, পুলিশ এবং কোস্টগার্ড সীমান্তে কড়া নজরদারি ও নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। প্রতিনিয়ত সারের বড় বড় চালান ও চুনোপুঁটিদের আটক করা সম্ভব হলেও সোনা মিয়ার মতো রাঘববোয়ালদের গায়ে আঁচড়ও লাগেনি।

মামলার পর মামলা হলেও মূল হোতারা কেন গ্রেপ্তার হচ্ছে না, তা নিয়ে স্থানীয় সাধারণ মানুষ ও সচেতন মহলে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

প্রশাসনের এই ‘রহস্যজনক ব্যর্থতা’র অবসান ঘটিয়ে সোনা মিয়াকে দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি উখিয়াবাসীর।

Viewer Image
×
লিংক কপি করা হয়েছে!