মেধা কি শুধু জন্মগত, নাকি যত্নের অভাব? প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার বৈষম্য নিয়ে প্রশ্ন
শাওন হোসেন, মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার: বাংলাদেশের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি অদ্ভুত প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়—যিনি দৌড়াতে জানেন, তাকেই দৌড় প্রতিযোগিতার কোচিং দেওয়া হচ্ছে। আর যার পায়ে চোট বা যিনি দৌড়াতে শেখেননি, তাকে মাঠের বাইরে রাখা হচ্ছে। দেশের নামী-দামী স্কুলগুলোতে ভর্তির ক্ষেত্রে ‘মেধাবী’ তকমাধারী শিক্ষার্থীদের যে জয়জয়কার, তা এখন এক গভীর প্রশ্নচিহ্নের মুখে। প্রশ্ন উঠেছে: স্কুল কি কেবল মেধাবীদের তকমা ধরে রাখার জায়গা, নাকি মেধাহীনকে মেধাবী করে গড়ে তোলার কারখানা?
‘ভর্তি যুদ্ধ’ নাকি বৈষম্যের সূতিকাগার?
একজন শিক্ষার্থী স্কুলে যায় কেন? সহজ উত্তর—জানার জন্য, শেখার জন্য। কিন্তু আমাদের দেশের তথাকথিত নামী স্কুলগুলোর মানদণ্ড ভিন্ন। তারা ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে ছেঁকে শুধু সেরা ছাত্রদেরই গ্রহণ করে।
অভিভাবক ও সচেতন মহলের প্রশ্ন, “আমি কিছু পারি না বলেই তো শিখতে স্কুলে এসেছি। আমি যদি সব পারতামই, তবে স্কুলের প্রয়োজন কী ছিল?” যারা আগে থেকেই সব পারে, তাদের পড়িয়ে ভালো রেজাল্ট করানোতে শিক্ষকের কৃতিত্ব কতটুকু, তা নিয়ে এখন বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
টিচারদের প্রকৃত যোগ্যতা কোথায়?
প্রকৃত শিক্ষকের সার্থকতা সেখানে নয় যেখানে তিনি একজন ফার্স্ট বয়কে ফার্স্ট রেখেছেন। বরং প্রকৃত সার্থকতা সেখানেই, যেখানে তিনি একজন পিছিয়ে পড়া, তথাকথিত ‘মেধাহীন’ ছাত্রকে নিবিড় যত্ন ও সঠিক নির্দেশনার মাধ্যমে মেধাবীতে রূপান্তর করেন।
বর্তমানে সিস্টেমটি এমনভাবে কাজ করছে যে:
মেধাবীরাই সুযোগ পাচ্ছে: ভালো পরিবেশ, ভালো শিক্ষক এবং বাড়তি যত্ন।
পিছিয়ে পড়া ছাত্ররা অবহেলিত: মেধা নেই অজুহাতে তাদের ভালো স্কুল থেকে দূরে রাখা হচ্ছে, যা প্রকারান্তরে তাদের আত্মবিশ্বাস ধ্বংস করে দিচ্ছে।
এটি কি স্পষ্ট বৈষম্য নয়?
সংবিধান ও মানবাধিকার অনুযায়ী প্রতিটি শিশুর মানসম্মত শিক্ষা পাওয়ার সমান অধিকার রয়েছে। কিন্তু ভর্তি পরীক্ষার নামে মেধাবীদের আলাদা করে ফেলা এবং কম মেধার ছাত্রদের ছুড়ে ফেলে দেওয়া এক ধরণের কাঠামোগত বৈষম্য। সমাজ যেখানে মেধাবীদের মূল্য দিতে গিয়ে ‘মেধাহীন’দের বাতিলের খাতায় ফেলে দিচ্ছে, সেখানে আমরা আসলে এক বিশাল জনশক্তিকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করছি।
প্রস্তাবিত পরিবর্তন: দরকার ‘ট্রেনিং’ ও ‘দৃষ্টিভঙ্গি’র বদল
শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন এখন সময়ের দাবি। বিশেষজ্ঞদের মতে:
অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা: স্কুলে ভর্তি হওয়া উচিত এলাকাভিত্তিক বা লটারির ভিত্তিতে, যেখানে সব ধরণের মেধার শিক্ষার্থী একসাথে পড়বে।
শিক্ষকদের বিশেষ প্রশিক্ষণ: শিক্ষকদের এমনভাবে প্রশিক্ষণ দিতে হবে যেন তারা পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের মনস্তত্ত্ব বোঝেন এবং তাদের বিশেষ যত্নে গড়ে তোলেন।
কৃতিত্বের সংজ্ঞা পরিবর্তন: কোনো স্কুল কতজন এ-প্লাস পেল, তা দিয়ে নয়; বরং স্কুলটি কতজন পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীকে টেনে তুলেছে, তা দিয়ে স্কুলের মান বিচার করা উচিত।
উপসংহার
মেধা কোনো স্থির বিষয় নয়; এটি চর্চা ও সুযোগের বিষয়। আমরা যদি সুযোগের অভাবে কোনো শিক্ষার্থীকে ‘মেধাহীন’ তকমা দিয়ে দূরে সরিয়ে রাখি, তবে সেই দায়ভার রাষ্ট্র এবং শিক্ষা ব্যবস্থাকেই নিতে হবে। “আমি পারি না বলেই শিখতে এসেছি”—শিক্ষার্থীর এই সহজ দাবির মর্যাদা দিতে না পারলে শিক্ষার আসল উদ্দেশ্যই ব্যর্থ থেকে যাবে।
