সাত মাসেও তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে না পাঠানোর অভিযোগ
সলিমগঞ্জ ভূমি অফিসের নায়েবের বিরুদ্ধে অর্থ লেনদেন ও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ
আর এ লায়ন সরকার,
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার সলিমগঞ্জ ইউনিয়ন ভূমি অফিসের ভূমি উপসহকারী কর্মকর্তা (নায়েব) মো. শফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে অর্থের বিনিময়ে তদন্ত প্রতিবেদন প্রভাবিত করা, প্রতিবেদন দিতে দীর্ঘসূত্রতা এবং পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগকারী দুদু মিয়া ও তার পরিবারের দাবি, ভূমি প্রতিকার আইনে দায়ের করা মামলা নং ১৮৬৪/২৫, গত ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে দায়ের করা মামলাটির তদন্তপূর্ব প্রতিবেদন তৈরির জন্য সলিমগঞ্জ ইউনিয়ন ভূমি অফিসে পাঠানো হলেও দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার পরও তা আদালতে পাঠানো হয়নি। এতে বাদী পক্ষ তাদের জমি নিয়ে চলমান বিরোধে ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন।
বাদী পক্ষের অভিযোগ, মামলাটি দায়েরের পর প্রায় সাত মাস অতিবাহিত হলেও তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে পাঠানো হয়নি। এ বিষয়ে তারা একাধিকবার সংশ্লিষ্ট ভূমি কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এমনকি নবীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে ফোনে যোগাযোগের পরও প্রতিবেদন আদালতে পাঠানো হয়নি বলে দাবি করেন তারা।
বাদী দুদু মিয়ার অভিযোগ, তদন্ত প্রতিবেদনের জন্য তার কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে। তবে পরবর্তীতে আর কোনো অনৈতিক সুবিধা না দেওয়ায় তার বিপক্ষে প্রতিবেদন তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা অবশ্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
দুদু মিয়ার ছেলে ইয়াকুব রানা সলিমগঞ্জ ভূমি অফিসে গিয়ে তদন্ত প্রতিবেদনের বিষয়ে জানতে চাইলে তাকে একটি স্বাক্ষরবিহীন প্রতিবেদনের খসড়ার ফটোকপি দেওয়া হয় বলে তিনি জানান। ওই খসড়ায় ১৮ মে সকাল ১০টায় তদন্ত করা হয়েছে বলে উল্লেখ রয়েছে।
খসড়া প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুদু মিয়ার স্ত্রী আনোয়ারা বেগম ২৫ মার্চ ২০০৯ সালের হেবা দলিলের মাধ্যমে জমির মালিকানা দাবি করেছেন। অপরদিকে বিবাদী রুবি বেগমের পক্ষে নবীনগর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের ১৬ জুলাই ২০২২ সালের ৮৫২৯/২২ নম্বর দলিলের মাধ্যমে তার মেয়ে বৃষ্টি আক্তারকে হেবা দলিল করে দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
বাদী পক্ষের দাবি, ২০০৯ সালের দলিলে তৎকালীন জমির মালিক সেনো মিয়া তার মেয়ের নামে রাস্তার সংলগ্ন প্রায় ১ দশমিক ৭৫ শতাংশ জমি লিখে দেন। পরবর্তীতে ওই জায়গার একটি অংশ জোরপূর্বক দখল করে ভবন নির্মাণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ তাদের।
তাদের আরও অভিযোগ, নিজেদের জমিতে যেতে গেলে দেশীয় অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে বাধা দেওয়া হচ্ছে। এ নিয়ে নবীনগর থানা ও নরসিংদী এলাকায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সাধারণ ডায়েরি ও অভিযোগ করা হয়েছে বলেও তারা দাবি করেন।
তবে তদন্তের জন্য তৈরি করা খসড়া প্রতিবেদনে ঘটনাস্থলে আইনশৃঙ্খলার অবনতির কোনো সম্ভাবনা নেই বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বাদী পক্ষের দাবি, বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে প্রতিবেদনের এই মন্তব্যের মিল নেই। তাদের অভিযোগ, তারা দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের জমিতে প্রবেশ করতে পারছেন না।
এ বিষয়ে সলিমগঞ্জ ইউনিয়ন ভূমি অফিসের নায়েব মো. শফিকুল ইসলামের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি প্রতিবেদনের নির্দিষ্ট তারিখ সম্পর্কে বলেন, উপর থেকে নির্দেশনা পাওয়া গেলে প্রতিবেদন কবে পাঠানো হবে তা জানানো হবে। অর্থ লেনদেন ও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগের বিষয়ে তার বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে বিবাদী পক্ষের পরিবারের সদস্য কাইয়ুমের দাবি, সংশ্লিষ্ট সম্পত্তি তাদের বাবা আনোয়ারা বেগমের নামে রাস্তার পাশে লিখে দিয়েছিলেন। তবে আনোয়ারা বেগমের অভিযোগ, রুবি বেগম রাস্তার পাশে প্রায় ৩ দশমিক ৫০ শতাংশ জমি দখল করে ভবন নির্মাণ করেছেন। সম্পত্তি ফিরে পেতে তিনি একাধিক মামলা করেছেন বলেও জানান।
বাদী পক্ষের অভিযোগ, অর্থের বিনিময়ে মামলার প্রতিবেদন পরিবর্তন বা প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তারা বিষয়টির নিরপেক্ষ তদন্ত, জমি-সংক্রান্ত বিরোধের সুষ্ঠু নিষ্পত্তি এবং দ্রুত আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন পাঠানোর দাবি জানিয়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে নবীনগর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) শারমিন সুলতানার মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন বলে জানান। তবে খোঁজ নিয়ে বিষয়টি জানাবেন বলে তিনি জানিয়েছেন।
স্থানীয়দের দাবি, ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে তদন্তে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা জরুরি। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে কোনো অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং বাদী পক্ষের ক্ষতি নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।