রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বলি এক সমাজসেবক: বাবার গ্রেফতার প্রসঙ্গে কিছু কথা
নুসরাত জাহান ইখা
সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের কল্যাণে আপনারা নিশ্চয়ই একটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক খবর অবগত হয়েছেন—গত ১ জুন, সোমবার রাতে আমার বাবা জাহাঙ্গীর আলম সওদাগরকে গ্রেফতার করা হয়েছে। একজন সন্তান হিসেবে আজ শুধু বুকভরা কান্না নয়, বরং গভীর এক নৈতিক দায়িত্ববোধ থেকে সমাজের সচেতন মহলের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছি। এই উদ্ভূত পরিস্থিতির নেপথ্যে যে জানা-অজানা কতটা বেদনা আর নোংরা স্থানীয় রাজনীতি লুকিয়ে রয়েছে, তা আজ আপনাদের বিবেকবান আদালতের সামনে তুলে ধরা জরুরি মনে করছি।
আমার বাবা জাহাঙ্গীর আলম সওদাগরের জীবনটা কেমন ছিল, তা মারুকা ইউনিয়ন ও দাউদকান্দির মানুষ দীর্ঘকাল ধরে অত্যন্ত কাছ থেকে দেখেছেন। রাজনীতি তাঁর কাছে কখনো ব্যক্তিগত অর্থ উপার্জনের হাতিয়ার কিংবা ক্ষমতার দাপট দেখানোর মাধ্যম ছিল না; এটি ছিল তাঁর একটি শখ, মানুষের কল্যাণ করার এক মানবিক নেশা। আর অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, আজ সেই জনসেবার স্পৃহাই তাঁকে এক নিষ্ঠুর পরিস্থিতির শিকার বানিয়েছে। যে রাজনীতির পেছনে ছুটতে গিয়ে, মানুষের মুখে অন্ন আর হাসি ফোটাতে গিয়ে তাঁকে নিজের পৈতৃক জমিজমা পর্যন্ত বিক্রি করতে হয়েছে; আজ জীবনের এই প্রান্তে এসে সেই রাজনীতির কারণেই তাঁকে অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হচ্ছে! তবে এই চরম সংকটের দিনেও যখন দেখি হাজারো মানুষ দলমত নির্বিশেষে তাঁর পাশে দাঁড়াচ্ছেন, তীব্র দুঃখ প্রকাশ করছেন, তখনই মনে হয়—মানুষের এই অকৃত্রিম ভালোবাসাই তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় সার্থকতা।
তিনি হয়তো একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের আদর্শকে মনেপ্রাণে ধারণ করতেন, কিন্তু তাঁর সামাজিক ও মানবিক পরিচয় ছিল দলীয় সংকীর্ণতার অনেক ঊর্ধ্বে। শিক্ষানুরাগী হিসেবে তাঁর নিষ্ঠা ছিল অতুলনীয়। তিনি চক্রতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির সভাপতি হিসেবে সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং স্কুলের অবকাঠামোগত উন্নয়নে অসামান্য অবদান রেখেছেন। এছাড়া দাউদকান্দি উপজেলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ চিনামূড়া এল.এন. উচ্চ বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির সদস্য হিসেবে টানা তিনবার নির্বাচিত হয়েছিলেন। দায়িত্ব থাকাকালীন এবং এর পরবর্তী সময়েও মৈনগুর, চক্রতলা, ভরনপাড়া, গোপালপুর, ওঝারখোলা, কৃষ্ণপুরসহ আশেপাশের বিভিন্ন এলাকার হাজারো ছাত্র-ছাত্রী ও অভিভাবকের কাছে তিনি ছিলেন এক পরম নির্ভরযোগ্য ও প্রিয় মুখ।
খেলাধুলা, সামাজিক কর্মকাণ্ড এবং শিক্ষার মান উন্নয়নে তিনি সবসময় নিরলসভাবে কাজ করেছেন। আমরা দেখেছি, এলাকার সাধারণ মানুষ বা কোনো শিক্ষার্থী সংকটে পড়লেই সবার আগে তাঁর কথা মনে করত। আর তিনিও পরনের সাধারণ লুঙ্গি আর গেঞ্জি পরেই তাৎক্ষণিকভাবে সেই সমস্যার সমাধানে ছুটে gেতেন। পরিবারের পক্ষ থেকে আমরা অনেক সময় তাঁকে বলতাম, “বাবা, একটু পরিপাটি হয়ে, ভালো পোশাক পরে যান।” তিনি উল্টো আমাদের মৃদু ধমক দিয়ে বলতেন—
> “মানুষের বিপদে পাশে থাকাটাই আমার আনন্দ। কারো কষ্টের কথা শুনলে আমি ঘরে বসে থাকতে পারি না। পোশাকের চাকচিক্যের চেয়ে মানুষের সমস্যার সমাধান করাটা অনেক বেশি জরুরি।”
> আজ সেই সরল, সাদাতাডা মানুষটিকেই চক্রান্তের বেড়াজালে বন্দি করা হয়েছে।
>
তিনি বিগত আট বছর অত্যন্ত সততার সাথে সরকারের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় হতদরিদ্রদের জন্য বরাদ্দকৃত চালের মারুকা ইউনিয়নের ডিলার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। যেখানে চাল চুরির শত শত গল্প আমরা শুনি, সেখানে তিনি শত শত পরিবারকে দিয়েছেন শতভাগ স্বচ্ছ ন্যায্য সেবা। অনেক সময় ব্যবসার লোকসান নিজের পকেট থেকে পূরণ করে তিনি নিয়ম মেনে গরিবের মুখে অন্ন তুলে দিয়েছেন। কাজের তদারকির দায়িত্বে থাকা সরকারি ম্যাজিস্ট্রেটরা বারবার তাঁর সততা ও কাজের প্রশংসিত করেছেন। তাঁর এই স্বচ্ছতার সাক্ষী মারুকা ইউনিয়নের আপামর জনগণ।
এছাড়া তিনি দাউদকান্দি উপজেলা সমবায় সমিতির (ইউসিসি) দুইবার ডাইরেক্টর নির্বাচিত হন। সমবায়ীদের অধিকার রক্ষায় তাঁর ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়। বিগত নির্বাচনেও তিনি মারুকা ও বিটেশ্বরসহ দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের বিপুল সমর্থনে পুনরায় প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পান। স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও তিনি দুইবার আপনাদের প্রতিনিধি হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন এবং আপনারা তাঁকে উজাড় করে ভোট দিয়েছিলেন। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে হয়তো তিনি ব্যালটের লড়াইয়ে বিজয়ী হতে পারেননি, কিন্তু আপনাদের হৃদয়ের সিংহাসন থেকে তিনি কখনো চ্যুত হননি।
আজ দেশের সচেতন নাগরিক ও বিবেকের কাছে আমার একটাই প্রশ্ন—আপনাদের সবার প্রিয় এই ‘জাহাঙ্গীর ভাই’, ‘জাহাঙ্গীর चाचा’ কিংবা ‘জাহাঙ্গীর সওদাগর’-এর অপরাধটা আসলে কী?
একটি দীর্ঘ সময় যে দল ক্ষমতায় ছিল, সেই সুবর্ণ সময়ে এলাকার একটি মানুষও কি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন—তিনি রাজনৈতিক ক্ষমতা খাটিয়ে কারও কোনো ক্ষতি করেছেন? কোনো অসামাজিক কর্মকাণ্ড, মাদক, অর্থ কেলেঙ্কারি, চাঁদাবাজি বা দখলদারিত্বের সাথে তাঁর দূরতম কোনো সম্পর্ক ছিল? রাজনৈতিক সুবিধা নিয়ে তিনি কি নিজের নামে এক শতাংশ জায়গাও ক্রয় করেছেন? বিবেকবান জনগণের আদালতের কাছে এই প্রশ্নগুলো আমি উন্মুক্ত রাখলাম।
তাহলে কেন আজ তাঁকে গ্রেফতার হতে হলো? তিনি তো আপনাদেরই ভাই, আপনাদের বন্ধু, আপনাদের সমাজের একজন সম্মানিত সদস্য। কিসের এজেন্ডা বাস্তবায়ন বা কার ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের জন্য এমন অমানবিক আচরণ করা হলো? আমরা মনে করি, আমাদের সমাজ, আমাদের ইউনিয়ন বা উপজেলারই কোনো চেনা মুখ, কোনো স্বার্থান্বেষী মহল পেছন থেকে এই ষড়যন্ত্রের নীল নকশা এঁকেছে। প্রশাসনকে সম্পূর্ণ ভুল, কাল্পনিক ও মিথ্যা তথ্য দিয়ে তারা নিজেদের ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক আক্রোশ চরিতার্থ করেছে।
১ জুন রাতের সেই ঘটনাটি আমাদের পুরো পরিবারকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। দেশের একজন শান্তিকামী ও সম্মানিত নাগরিক হিসেবে আমার বাবা সবসময় আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। আমরা বিশ্বাস করি, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করা হয়েছে এবং আইনি প্রক্রিয়ার ভুল ব্যাখ্যার মাধ্যমে তাঁকে একটি রাজনৈতিক মামলায় জড়ানো হয়েছে।
আমরাও চাই সত্যিকারের অপরাধীদের বিচার হোক। যারা মানুষের ওপর জুলুম, অত্যাচার, দুর্নীতি ও নির্যাতন চালিয়েছে, তাদের কঠোর শাস্তি হোক। কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে একজন নিরপরাধ, সমাজসেবক মানুষের জীবন নিয়ে এমন অমানবিক খেলা দয়া করে বন্ধ করুন।
আমরা দেশের প্রচলিত আইন, প্রশাসন এবং বিজ্ঞ আদালতের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধাশীল। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, সঠিক ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রশাসন প্রকৃত সত্য উদঘাটন করতে পারবে এবং মহামান্য আদালত আমার বাবার সম্পূর্ণ নিরপরাধ হওয়ার বিষয়টি অনুধাবন করে তাঁকে সসম্মানে মুক্তি দেবেন। আমরা শুধু একটি ন্যায়সঙ্গত ও নিরপেক্ষ বিচার ব্যবস্থার প্রত্যাশা করছি।
