পদ্মাপারের জীবন যখন ভাগ্যের হাতে: স্বাস্থ্যসেবা যেখানে ‘সোনার হরিণ’
মোঃ শামীম আহমেদ, শিবচর উপজেলা প্রতিনিধি
কৃষি ও মৎস্য সম্পদে সমৃদ্ধ হয়ে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখলেও মৌলিক অধিকার ‘স্বাস্থ্যসেবা’ থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার চরজানাজাতের মানুষ। চারদিকে প্রমত্তা পদ্মা, আর মাঝখানে দুই হাজার মানুষের এক বিচ্ছিন্ন জনপদ। এখানে অসুস্থ হওয়া মানেই প্রকৃতির করুণার ওপর নির্ভর করা। যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা আর চিকিৎসার অভাবে চরের মানুষের কাছে স্বাস্থ্যসেবা আজ এক অলীক কল্পনা বা ‘সোনার হরিণ’।
অন্ধকারে প্রসূতি ও নবজাতক
চরের সবচেয়ে বড় আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রসূতি মায়েদের জরুরি সেবা। নিরাপদ প্রসবের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অনেক মা ঘরেই সন্তান প্রসব করতে বাধ্য হন। বাসিন্দাদের ভাষ্যমতে, মাঝরাতে কোনো প্রসূতির প্রসববেদনা উঠলে নৌকা পাওয়া এক দুঃসাধ্য ব্যাপার। দুই ঘণ্টার দীর্ঘ নদীপথ পাড়ি দিয়ে যখন সদর হাসপাতালে পৌঁছানো হয়, ততক্ষণে অনেক মা বা নবজাতকের জীবন সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে। স্থানীয় বাসিন্দা জুলেখা বেগম বলেন, “মাঝরাতে নৌকা মেলে না। গত মাসে অনেক কষ্টে ভোরে নদী পার হয়েছি। একটু দেরি হলে হয়তো বাঁচতামই না।”
হাতুড়ে ডাক্তার আর ঝাড়ফুঁকই ভরসা
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, এই চরে নেই কোনো সরকারি বা বেসরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র। ফলে সাধারণ সর্দি-জ্বর থেকে শুরু করে ডায়রিয়া কিংবা শিশুদের অপুষ্টিজনিত সমস্যায় স্থানীয়দের একমাত্র ভরসা কবিরাজ বা হাতুড়ে ডাক্তার। আধুনিক চিকিৎসার অভাবে চরের মানুষ এখনও ঝাড়ফুঁকের মতো আদিম প্রথায় বিশ্বাস রাখতে বাধ্য হচ্ছে। শ্বাসকষ্টে ভোগা বৃদ্ধ জব্বার মোল্লা আক্ষেপ করে বলেন, “কত মানুষ প্রতিশ্রুতি দিল, হাসপাতাল হলো না। আমাদের কষ্ট যেন কারো চোখেই পড়ে না।”
জরুরি সেবায় বড় বাধা নদী ও যোগাযোগ
২০২১ সালে জেগে ওঠা এই চরে ২০২২ সাল থেকে মানুষের স্থায়ী বসবাস শুরু হলেও তৈরি হয়নি কোনো টেকসই যোগাযোগ ব্যবস্থা।
নৌ-অ্যাম্বুলেন্সের অভাব: জরুরি রোগী বহনের জন্য কোনো স্পিডবোট বা নৌ-অ্যাম্বুলেন্স নেই।
প্রতিকূল আবহাওয়া: বর্ষায় তীব্র স্রোত আর কুয়াশার রাতে নদী পারাপার প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
সময়ক্ষেপণ: চর থেকে মূল ভূখণ্ডে পৌঁছাতে সময় লাগে কমপক্ষে দুই ঘণ্টা, যা জরুরি রোগীর ক্ষেত্রে মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
কর্তৃপক্ষ কী বলছে?
মাদারীপুর জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপপরিচালক মতিউর রহমান জনবল সংকটের কথা স্বীকার করে বলেন, “বর্তমানে উপ-সহকারী চিকিৎসা কর্মকর্তা সপ্তাহে দুই দিন সেবা দিচ্ছেন। আমরা মাসে অন্তত একদিন বিশেষ চিকিৎসাসেবা চালুর পরিকল্পনা করছি।” তিনি আরও জানান, চরে স্থায়ী কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপনের জন্য ৩০ শতাংশ জমি প্রয়োজন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) মাধ্যমে জমি পাওয়া গেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চরের মানুষের দাবি
চরজানাজাত ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মোতালেব বেপারীসহ সাধারণ বাসিন্দাদের একটাই দাবি—
১. চরে দ্রুত একটি স্থায়ী কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন করা।
২. পর্যাপ্ত ওষুধ ও জনবল নিশ্চিত করা।
৩. জরুরি রোগী পরিবহনের জন্য সরকারি উদ্যোগে একটি নৌ-অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করা।
দেশের মূল ধারার উন্নয়নের সুফল যেন পদ্মার এই বিচ্ছিন্ন চরের মানুষের কাছেও পৌঁছায়—এখন এটাই চরজানাজাতবাসীর প্রধান চাওয়া।
