মাদকের বিরুদ্ধে নিষ্ক্রিয়তা: প্রশ্নের মুখে কালীগঞ্জ থানার ওসির ভূমিকা
নিজস্ব প্রতিবেদক:
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলায় মাদকের বিস্তার এখন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে মাদকসেবী ও ব্যবসায়ীদের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। স্থানীয়দের অভিযোগ, এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকর ভূমিকা না থাকায় দিন দিন পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটছে। বিশেষ করে থানার বর্তমান অফিসার ইনচার্জ (ওসি)-এর ভূমিকা নিয়ে জনমনে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন ও ক্ষোভ।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কালীগঞ্জ পৌর এলাকা ছাড়াও কাশিপুর, চাচড়া, শিবনগর, আড়পাড়া, নদী-আড়পাড়া, ঢাকালে পাড়া, বলিদাপাড়া, সিংঙ্গী, রায়গ্রাম, দুলালবন্দিয়া, ফয়লা, হেলাই, মাস্টারপাড়া, পাইকপাড়া, চাপালী, শ্রীরামপুর, আনন্দবাগ, খয়েরতলা, বাকুলিয়া, ভাটপাড়া, মহাদেবপুর ও আলাইপুরসহ আশপাশের প্রায় সব গ্রামেই মাদকের বিস্তার ঘটেছে। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত এসব এলাকায় প্রকাশ্যে মাদক বেচাকেনা চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ইয়াবা, ফেন্সিডিল ও গাঁজার পাশাপাশি নতুন করে ট্যাফেন্ডাডল নামের নেশাজাতীয় ট্যাবলেটও সহজলভ্য হয়ে উঠেছে। কিশোর-তরুণরা খুব সহজেই এসব মাদকের নাগাল পাচ্ছে, যা তাদের দ্রুত নেশার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। স্থানীয়দের মতে, ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সী অনেক কিশোর ইতোমধ্যেই মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে, যা ভবিষ্যতের জন্য এক ভয়াবহ সংকেত।
অভিযোগ রয়েছে, মাদক ব্যবসায়ীরা শুধু বিক্রিই করছে না, বরং বাইরের জেলা থেকে আগত মাদকসেবীদের জন্য নিরাপদ আস্তানাও তৈরি করে দিচ্ছে। ফলে কালীগঞ্জ এখন একপ্রকার নেশার হাট হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে বলে আশঙ্কা করছেন সচেতন মহল।
এলাকাবাসীর ভাষ্য অনুযায়ী, মাদকাসক্তির কারণে অপরাধের হারও আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। নেশার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে অনেক তরুণ চুরি, ছিনতাই, রাহাজানি এমনকি ডাকাতির মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এতে করে পরিবারে অশান্তি এবং সমাজে নিরাপত্তাহীনতা চরম আকার ধারণ করেছে।
স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বর্তমান ওসি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে মাদকের বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য কোনো অভিযান চোখে পড়েনি। মাঝে মধ্যে অভিযান হলেও তা অনেকটা আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকছে বলে তাদের অভিযোগ। গ্রেফতার হওয়া মাদক ব্যবসায়ীরা অল্প সময়ের মধ্যেই জামিনে বের হয়ে আবার একই ব্যবসায় ফিরে আসছে।
আরও গুরুতর অভিযোগ হলো-কিছু মাদক ব্যবসায়ীর সঙ্গে পুলিশের একটি অংশের যোগসাজশ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, মাসিক চুক্তির মাধ্যমে মাদক ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। যদিও এসব অভিযোগের সত্যতা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রমাণিত হয়নি, তবুও বিষয়টি এলাকায় ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে এবং জনমনে আস্থার সংকট তৈরি করছে।
এছাড়াও বর্তমান ওসির পেশাগত দায়িত্ব পালনে উদাসীনতার অভিযোগ তুলেছেন অনেকেই। তাদের দাবি, তিনি মাঠপর্যায়ে তেমন সক্রিয় নন এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নিতে দেখা যায় না। বরং অবসরে বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে ভ্রমণ ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছবি পোস্ট নিয়েই তিনি বেশি ব্যস্ত থাকেন, এমন মন্তব্যও করেছেন কেউ কেউ।
অন্যদিকে, থানার পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, মাদকবিরোধী অভিযান নিয়মিত পরিচালনা করা হচ্ছে এবং মাদক নির্মূলে তারা কঠোর অবস্থানে রয়েছেন। তবে স্থানীয়দের মতে, বাস্তব চিত্র এর সম্পূর্ণ বিপরীত।
সুশীল সমাজ, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মতে, দ্রুত কার্যকর ও সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে কালীগঞ্জের একটি পুরো প্রজন্ম মাদকের কবলে পড়ে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। তারা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন মহলের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন এবং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যদি আন্তরিকতা, স্বচ্ছতা ও কঠোরতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে, তাহলে এখনো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। অন্যথায় মাদকের এই ভয়াল ছোবল কালীগঞ্জকে আরও গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দেবে।
