যে বয়সে হাসি-আনন্দ, খেলাধুলা আর মীনা কার্টুন দেখে সময় কাটানোর কথা, যে বয়সে মা-বাবার আদর-শাসনে বেড়ে ওঠার কথা, সেই বয়সেই জীবিকার তাগিদে চায়ের দোকান সামলাচ্ছে ১৩ বছর বয়সী আরাফাত। রাজধানীর উত্তরা ১৭ নম্বর সেক্টরসংলগ্ন ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের কাছেই তার ছোট্ট একটি চায়ের দোকান।
টিন দিয়ে তৈরি দোকানটিতে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ব্যস্ত সময় কাটে আরাফাতের। চায়ের পাশাপাশি সেখানে বিক্রি হয় বনরুটি, কলা, চিপস, পানি ও বিস্কিট। আছে বিড়ি-সিগারেটও। ক্রেতাদের চা পরিবেশন, পণ্য সাজানো আর দোকান সামলানোর মধ্য দিয়েই কেটে যায় তার দিনের বড় একটি অংশ।
আরাফাত জানায়, আগে সে মামার দোকানে কাজ করত। এখন বসে নিজেদের দোকানে। খুব সকালে দোকানে আসে, থাকে সন্ধ্যা পর্যন্ত। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছে সে। অভাবের সংসারে পড়াশোনায় আর মনোযোগ দিতে পারেনি বলে জানায় আরাফাত।
অথচ এই বয়সে তার সময় কাটার কথা ছিল বই-খাতা, বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা আর আনন্দে। কিন্তু বাস্তবতার চাপে শৈশবের স্বাভাবিক আনন্দের বদলে দোকান সামলানোর দায়িত্ব নিতে হয়েছে তাকে। আরাফাতের গল্প তাই কেবল একটি চায়ের দোকানের গল্প নয়; এটি অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে বেড়ে ওঠা এক শিশুর স্বপ্ন ও সংগ্রামের গল্প।
আরাফাতের দোকানে প্রতিদিন ভিড় করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। আসেন শিক্ষক ও কর্মচারীরাও। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে চলে আড্ডা, গল্প আর পরিচিতজনদের সঙ্গে সময় কাটানো। দোকানে আসা অনেকেই আরাফাতকে পছন্দ করেন। সবার সঙ্গে মিশে কাজ করে সে।
তবে এই ব্যস্ততার মাঝেও আরাফাতের মনে রয়েছে বড় হওয়ার স্বপ্ন। একদিন বড় ব্যবসায়ী হতে চায় সে। তার স্বপ্ন, নিজের উপার্জনে মা-বাবার মুখে হাসি ফোটাবে। অভাবের কারণে ভবিষ্যতে যেন আর কোনো স্বপ্ন বাধাগ্রস্ত না হয়—এমন প্রত্যাশাও তার।
শিশুশ্রমের বাস্তবতা ও শিশুর অধিকার
আরাফাতের গল্প বাংলাদেশের শিশুদের অধিকার ও শিশুশ্রমের বাস্তবতা নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করে। ইউনিসেফ বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) অনুযায়ী, ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের ৯ দশমিক ২ শতাংশ শিশুশ্রমে যুক্ত।
তবে কোনো শিশু কাজ করলেই তার কাজের ধরন, পরিবেশ, বয়স এবং পড়াশোনার ওপর প্রভাব বিবেচনা না করে আইনগতভাবে শিশুশ্রমের সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। আরাফাতের ক্ষেত্রেও কাজের প্রকৃতি ও পরিস্থিতি যাচাই করা জরুরি।
জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদে শিশুর শিক্ষা, বিশ্রাম, খেলাধুলা এবং অর্থনৈতিক শোষণ ও ক্ষতিকর কাজ থেকে সুরক্ষার অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। সনদের ২৮ অনুচ্ছেদে শিক্ষার অধিকার এবং ৩১ অনুচ্ছেদে বিশ্রাম ও খেলাধুলার অধিকারের কথা বলা হয়েছে।
এই অধিকারগুলোর আলোকে আরাফাতের মতো শিশুর জীবন নিয়ে প্রশ্ন ওঠে—অর্থনৈতিক সংকটের কারণে যেন তাদের পড়াশোনা বন্ধ না হয়, সে জন্য কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন? পরিবারকে সহযোগিতা করা, শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ কাজ থেকে শিশুদের সুরক্ষা দেওয়া এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া: পরিবর্তনের পথে বাধা
বাংলাদেশে প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষায় অংশগ্রহণের অগ্রগতি থাকলেও পরবর্তী শ্রেণিগুলোতে শিশুদের একটি অংশ শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ে। ইউনিসেফ বাংলাদেশের শিক্ষা-বিষয়ক তথ্যে শিশুশ্রমকে ছেলেদের স্কুল থেকে ঝরে পড়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
আরাফাত পঞ্চম শ্রেণির পর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেনি। তার ক্ষেত্রে অভাবের সংসার একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হিসেবে উঠে এসেছে। তবে তাকে আবার শিক্ষার ধারায় ফেরানোর জন্য কী সুযোগ রয়েছে, পরিবার কী ধরনের সহায়তা পেতে পারে এবং স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কী ভূমিকা রাখতে পারে—সেসব বিষয়ও অনুসন্ধান করা প্রয়োজন।
কারণ শিক্ষা শুধু একটি সনদ অর্জনের মাধ্যম নয়; এটি শিশুর জ্ঞান, দক্ষতা, আত্মবিশ্বাস ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা বিকাশের পথ। আরাফাতের মতো শিশুরা যেন আর্থিক সংকটের কারণে এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হয়, তা নিশ্চিত করতে পরিবার, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
পরিবর্তনের প্রতিনিধি হতে পারে শিশুরাই
আরাফাতের স্বপ্ন একদিন বড় ব্যবসায়ী হওয়া, মা-বাবার মুখে হাসি ফোটানো। তার এই স্বপ্নের মধ্যে রয়েছে নিজের জীবন বদলে দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু পরিবর্তনের প্রতিনিধি হিসেবে এগিয়ে যাওয়ার জন্য শুধু ব্যক্তিগত ইচ্ছাশক্তিই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন শিক্ষা, নিরাপদ পরিবেশ ও প্রয়োজনীয় সহায়তার সুযোগ।
শিশুরা সুযোগ পেলে নিজেদের জীবন বদলানোর পাশাপাশি পরিবার ও সমাজের উন্নয়নেও অবদান রাখতে পারে। তাই আরাফাতের মতো শিশুদের স্বপ্নকে গুরুত্ব দেওয়া, তাদের কথা শোনা এবং শিক্ষা ও বিকাশের পথ তৈরি করা জরুরি।
একদিন বড় ব্যবসায়ী হয়ে মা-বাবার মুখে হাসি ফোটাতে চায় আরাফাত। এখন সেই স্বপ্ন পূরণের পথে প্রয়োজন এমন সুযোগ তৈরি করা, যাতে জীবনের দায়িত্ব সামলানোর পাশাপাশি সে শিক্ষা ও শৈশবের আনন্দ ফিরে পাওয়ার পথ খুঁজে পায়।
আরাফাতের গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রতিটি শিশুরই স্বপ্ন দেখার অধিকার রয়েছে। সেই স্বপ্ন যেন অভাবের কারণে থেমে না যায়, তা নিশ্চিত করাই হতে পারে একটি শিশুবান্ধব সমাজ গড়ার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।