ভেদরগঞ্জে জেলেদের চাল বিতরণে অনিয়ম, জনপ্রতি ৬–১০ কেজি কম দেওয়ার অভিযোগ
আল আমীন সরদার
ভেদরগঞ্জ (শরীয়াত পুর) প্রতিনিধি
শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জে মা ইলিশ আহরণ থেকে বিরত থাকা জেলেদের জন্য বরাদ্দকৃত চাল বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় প্যানেল চেয়ারম্যান, ট্যাগ অফিসার, ইউনিয়ন সচিব ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রত্যেক জেলেকে ৬ থেকে ১০ কেজি করে চাল কম দেওয়ার অভিযোগ করেছেন উপকারভোগীরা।
ভেদেরগঞ্জ উপজেলার সখিপুর থানার দক্ষিণ তারাবুনিয়া ইউনিয়ন পরিষদে এ ঘটনা ঘটে।
সরেজমিনে ও উপকারভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জাটকা সংরক্ষণ ও ইলিশ উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে পদ্মা ও মেঘনা নদীর অভয়াশ্রম এলাকায় মাছ ধরা দুই মাসের জন্য নিষিদ্ধ করেছে সরকার। ১ মার্চ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত দেশের পাঁচটি অভয়াশ্রমে ইলিশসহ সব ধরনের মাছ আহরণ বন্ধ রাখা হয়েছে।
নিষেধাজ্ঞাকালীন সময়ে নিবন্ধিত ১,০৫০ জন জেলেকে জীবিকা সহায়তা হিসেবে সরকার মৎস্য অধিদপ্তরের মাধ্যমে ভিজিএফ কর্মসূচির আওতায় প্রত্যেককে ৮০ কেজি করে চাল দেওয়ার কথা। প্রতি বছর মা ইলিশ আহরণ থেকে বিরত থাকা প্রকৃত মৎস্যজীবীদের জীবনযাত্রা নির্বাহে এ সহায়তা প্রদান করা হয়।
কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, দক্ষিণ তারাবুনিয়া ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান সেকান্দার খান প্রত্যেক জেলেকে ৬ থেকে ১০ কেজি চাল কম দিয়েছেন।
নিয়ম অনুযায়ী সকাল ৮টা থেকে চাল বিতরণ শুরু হওয়ার কথা থাকলেও ট্যাগ অফিসার হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত ভেদরগঞ্জ উপজেলা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা জাহিদুর রহমান সরকার উপস্থিত হওয়ার আগেই সকাল ৭টা থেকে চাল বিতরণ শুরু করেন প্যানেল চেয়ারম্যান ও তার সহযোগীরা। চাল ওজন করে দেওয়ার কথা থাকলেও তা অনুসরণ না করে ইচ্ছেমতো চাল বিতরণ করা হচ্ছিল বলে অভিযোগ ওঠে।
চাল বিতরণে অনিয়মের খবর পেয়ে স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীরা ঘটনাস্থলে গেলে প্রত্যেক জেলেকে নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে কম চাল দেওয়ার বিষয়টি দেখতে পান।
পরে বিষয়টি ভেদরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হাফিজুল হককে জানানো হলে তিনি সহকারী কমিশনার (ভূমি) কে. এম. রাফসান রাব্বি ও সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. আব্দুল্লাহ আল ইমরানকে ঘটনাস্থলে পাঠান। তারা সেখানে গিয়ে অনিয়মের সত্যতা পান এবং উপস্থিত থেকে অবশিষ্ট জেলেদের মধ্যে নির্ধারিত পরিমাণ চাল বিতরণ নিশ্চিত করেন।
ট্যাগ অফিসার উপস্থিত হওয়ার আগে চাল বিতরণ এবং ওজনে কম দেওয়ার বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে প্যানেল চেয়ারম্যান সন্তোষজনক কোনো জবাব দিতে পারেননি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়। এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।
দক্ষিণ তারাবুনিয়ার জেলে মোস্তফা মাঝী বলেন,
“আমাকে ৮০ কেজি চাল দেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু দিয়েছে ৭০ কেজি। জিজ্ঞেস করলে বলে চাল কম এসেছে। আমরা গরিব মানুষ, কথা বললেও কেউ শোনে না।”
মালবাজার এলাকার ফয়সাল হোসেন বলেন,
“বাবার নামে চাল নিতে এসেছিলাম। মেপে দেখি ৭২ কেজি হয়েছে। বলা হয়েছে উপজেলা থেকে চাল কম এসেছে। পরে সাংবাদিকরা আসার পর আবার ৮০ কেজি করে দিতে দেখলাম।”
নুরুদ্দী এলাকার এক জেলে বলেন,
“সরকারের নির্দেশ মেনে মাছ ধরা বন্ধ রেখেছি। সংসার চালানো কষ্ট হয়ে গেছে। তার ওপর চালও কম দেওয়া হচ্ছে। প্রতিবাদ করলে পরে সমস্যায় পড়তে হবে—এই ভয়ে কেউ কিছু বলতে চায় না।”
অভিযুক্ত প্যানেল চেয়ারম্যান সেকান্দার খান অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন,
“আমি সঠিক মাপেই চাল বিতরণ করছি। কোনো সমস্যা নেই।”
চাল কম দেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে সাংবাদিকদের ঘটনাস্থল ত্যাগ করতে বলেন।
দায়িত্বপ্রাপ্ত ট্যাগ অফিসার জাহিদুর রহমান সরকার বলেন,
“দুই–তিন কেজি কম হতে পারে, বস্তায় কিছু চাল কম থাকে। এ বিষয়ে চেয়ারম্যান ও সচিবের সঙ্গে কথা বলতে পারেন।”
ভেদরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হাফিজুল হক বলেন,
“অনিয়মের সংবাদ পেয়ে সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তাকে ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছে। তারা অনিয়মের সত্যতা পেয়েছেন। প্রাপ্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
