জুলাই গণ-অভ্যূত্থান পরবর্তী বন্দোবস্তে পুলিশের সামান্য চাওয়া
.
পাঁচই আগস্টের পর কয়েক দিন পুলিশ বাহিনীর জন্য স্বাভাবিক দায়িত্ব পালন করা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। কোন কর্মস্থলেই পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তা ছিল না। যে সব পুলিশ স্থাপনা জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছিল সেগুলোর বাইরেও অক্ষত পুলিশ স্থাপনাগুলোও আন্দোলনকারী কিংবা স্বার্থান্বেষী তৃতীয় পক্ষের আক্রমণের শিকার হয়েছিল।
এ অবস্থায় কিছু নিম্ন পদস্থ পুলিশ সদস্য কর্মবিরতি ঘোষণা করেছিল। তাদের কর্মবিরতির সাথে না হলেও তাদের দাবীর সাথে সকল শ্রেণির পুলিশ সদস্য এমনকি নবগঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও একমত ঘোষণা করেছিল। তবে পুলিশের নূতন নেতৃত্বের দূরদর্শিতায় সেই কর্মবিরতি কার্যকর হয়নি। কারণ পুলিশ নেতৃত্ব বিশ্বাস করে, There is no right to strike against the public safety by anybody, anywhere, any time. তাই পুলিশ সদস্যগণ দ্রুতই কর্মস্থলে ফিরে গিয়ে নাজুক আইন-শৃঙ্খল পরিস্থিতির উন্নয়নে আত্মনিয়োগ করেছিল।
কর্মবিরতির পিছনে পুলিশ সদস্যদের একমাত্র চাওয়া ছিল পুলিশের সংস্কার। পুলিশ সংস্কারের একটি কাঠামো ২০০৭ সাল থেকেই দেশবাসীর কাঝে উপস্থাপিত ছিল। উপনিবেশ যুগের জন্য তৈরি করা বর্তমান পুলিশ আইনটির পরিবর্তে একটি যুগোপযুগী পুলিশ আইন বা অধ্যাদেশ প্রণয়নের দাবী পুলিশ সদস্যদের দীর্ঘ দিনের। এক এগার এর সরকার থেকে শুরু করে ২৪ এর সরকারের কাছেও তাদের একই দাবী। আমরা সংস্কার চাই। আমরা জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য অবস্থান তৈরি করার পরিবেশ চাই। পৃথিবীর ইতিহাসে সম্ভবত, বাংলাদেশ পুলিশই একমাত্র পুলিশ ফোর্স যাদের নিম্নতম পদ থেকে সর্বোচ্চ পদের সদস্যরাও নিজেদের সংস্কারে দাবী জানিয়ে আসছে। বেতন, ভাতা বৃদ্ধি নয়, সুযোগ সুবিধার বিস্তৃতি নয়- কেবলই সংস্কার। মানে বর্তমানের ‘পতিত অবস্থা’ থেকে উদ্ধার।
উপনিবেশ আমলের আইন দিয়ে কোন স্বাধীন দেশ যে মর্যাদাপূর্ণ পুলিশ বাহিনী গঠন করতে পারে, তা আমার জানা নেই। এমনকি যে ব্রিটিশরা আমাদের ১৮৬১ সালে কলোনি-শাসনের উপযুগী আইন দিয়েছিল, সেই ব্রিটিশ ভূখণ্ডেও ২০০০ সালের পূর্বের কোন পুলিশ আইন নেই। লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশের ১৮২৯ সালের আইনটি অনেকবার সংশোধিত হয়ে নানা উপরিকাঠামো দিয়ে যুযোপযুগী করা হয়েছে। স্কটল্যান্ড রাজ্যের পুলিশ এখন ২০১২ সালের আইনে চলে।
বিবর্তনের সাথে সাথে যে রাষ্ট্র ব্যবস্থায় পরিবর্তন হয় না, সেখানেই অধঃপতন দেখা দেয়। অথচ, আমরা অধঃপতনে কতই না স্বাচ্ছন্দবোধ করি। যে কোন সংস্কার প্রবর্তিত হলেই কোন না কোন বণ্টনমূলক জোটের স্বার্থ হুমকির সম্মুখীন হয়। কোন গোষ্ঠীই তাদের স্বার্থের ব্যাপারে আদৌ কোন আপোষ করতে রাজি নয়।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতি সরকারি কর্মচারীগণ কত প্রকারের দাবী-দাওয়া পেশ করছে। গণহারে পদোন্নতি, ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি এমনকি মরণোত্তর পদোন্নতির সুযোগও লাভ করেছে অনেকে। বেতন-স্কেল, পদমর্যাদা, জাতীয়করণ কত কি ধরনের দাবীই না সরকারি, আধা-সরকারি কর্মকর্তারা আদায় করছেন। টানা রাজপথে থেকে দাবী আদায় করে ঘরে ফেরার ঘটনাও প্রচুর। নিজেদের কর্তৃত্বের সামান্যতমও বিচ্যূতি কিংবা হ্রাসের বিরুদ্ধেও অনেকেই কর্মবিরতি পালন করেছেন। এসবই হল সরকারি কর্মচারীদের হয় ব্যক্তিগত কিংবা শ্রেণিগত স্বার্থ ও কর্তৃত্ব বজায় রাখার দাবী।
কিন্তু বাংলাদেশের একটি মাত্র সরকারি সংগঠন যারা ব্যক্তিগত কিংবা শ্রেণিগত স্বার্থে নয়, পুরোপুরি জনস্বার্থে সংগঠনের সংস্কার ও নিজেদের পবিবর্তনের সুযোগ প্রত্যাশা করছে। কিন্তু আমরা এমন এক সমাজে বসবাস করি, এমন এক সিস্টেমের মধ্যে নিজেদের পরিচালনা করি, পুলিশ সদস্যদের এমন নিঃস্বার্থ চাওয়াটুকুও পূরণের গরজ কারও নেই।
লেখক : মো: আব্দুর রাজ্জাক
মেম্বার ডিরেক্টিং স্টাফ, পুলিশ স্টাফ কলেজ, বাংলাদেশ।
