টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে ১৬৯ নম্বর ভাওয়াল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আব্দুর রাজ্জাকের বিরুদ্ধে চরম অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।
এসব অনিয়মের প্রতিকার চেয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও অভিভাবকরা। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর থেকে ক্ষোভে ফুঁসছেন অভিভাবক ও স্থানীয় সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।
স্থানীয় সূত্র ও লিখিত অভিযোগ থেকে জানা যায়, শিক্ষার প্রসারে ২০০৭ সালে ‘ভাওয়াল পল্লী উন্নয়ন যুব সমিতি’র উদ্যোগে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে ২০১৩ সালে এটি জাতীয়করণ হয়ে '১৬৯ নম্বর ভাওয়াল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়' হিসেবে স্বীকৃতি পায়। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই সহকারী শিক্ষক আব্দুর রাজ্জাক বিদ্যালয়টির ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব সামলে আসছেন।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, ২০১৮ সালে জারিফা পারভীন নামের একজন স্থায়ী প্রধান শিক্ষক বিদ্যালয়ে যোগদান করেছিলেন। কিন্তু ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আব্দুর রাজ্জাকের অব্যাহত অসহযোগিতা ও দুর্ব্যবহারের কারণে মাত্র পাঁচ মাসের মাথায় তিনি বদলি হয়ে যেতে বাধ্য হন। এরপর থেকে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে আব্দুর রাজ্জাক পুনরায় পদটি ধরে রাখেন।
অভিযোগকারীদের দাবি, আব্দুর রাজ্জাক উপবৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অনিয়মতান্ত্রিকভাবে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, পরীক্ষার ফি বাবদ টাকা নেওয়া, স্বাধীনতা ও বিজয় দিবসের ভুয়া ভাউচার তৈরি করে টাকা আত্মসাৎ এবং সরকারি মেরামত ও সংস্কার বরাদ্দের সিংহভাগ টাকা পকেটে পুরেছেন। বছরের পর বছর বিদ্যালয়ের আয়-ব্যয়ের কোনো অডিট বা জবাবদিহিতা করা হয়নি; এমনকি অন্যান্য সহকারী শিক্ষকদেরও এসব হিসাব থেকে দূরে রাখা হতো। এছাড়া কোমলমতি শিক্ষার্থীদের দিয়ে টয়লেট পরিষ্কার করানোর মতো অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সরকারি নিয়ম তোয়াক্কা না করে বিভিন্ন দাপ্তরিক কাগজপত্রে ‘ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক’-এর বদলে ‘প্রধান শিক্ষক’ হিসেবে সিল ও স্বাক্ষর করছেন আব্দুর রাজ্জাক। শুধু তাই নয়, বিদ্যালয়ের সরকারি দুটি কম্পিউটার, একটি প্রিন্টার, মাল্টিমিডিয়াসহ বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক সরঞ্জাম নিজের বাসায় এনে ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করছেন তিনি।
রহস্যজনকভাবে, আব্দুর রাজ্জাকের বেআইনি ‘প্রধান শিক্ষক’ সিলের পাশে ক্লাস্টারের দায়িত্বে থাকা সহকারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জিএম ফুয়াদের অনুমোদিত স্বাক্ষরও দেখা গেছে। অন্যদিকে, প্রচণ্ড গরমের মধ্যেও শ্রেণিকক্ষের নষ্ট বৈদ্যুতিক পাখাগুলো মেরামত না করায় চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের, ব্যাহত হচ্ছে পাঠদান।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আব্দুর রাজ্জাক কিছু বিষয়ে অনিয়মের কথা স্বীকার করেন। ‘প্রধান শিক্ষক’ পদবির সিল ব্যবহারের বিষয়ে তিনি দাবি করেন, ক্লাস্টার কর্মকর্তা জিএম ফুয়াদ মিয়াকে অবহিত করেই তিনি এটি করেছেন। এছাড়া স্কুলের কম্পিউটার ও সরঞ্জাম বাসায় রেখে ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারের বিষয়টিও তিনি নির্দ্বিধায় স্বীকার করেন। তবে স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নিয়োগ না হওয়ার বিষয়ে তিনি চলমান একটি মামলার অজুহাত দেন।
এ বিষয়ে ক্লাস্টার কর্মকর্তা ও সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা জিএম ফুয়াদ বলেন, “মামলার কারণে প্রধান শিক্ষক পদায়ন বন্ধ আছে।” তবে ‘ভারপ্রাপ্ত’ না লিখে সরাসরি ‘প্রধান শিক্ষক’ হিসেবে সিল দেওয়ার নিয়ম আছে কি না জানতে চাইলে তিনি দায় এড়িয়ে বলেন, “এ বিষয়ে আমার ঊর্ধ্বতন শিক্ষা কর্মকর্তা বলতে পারবেন। অভিযোগের বিষয়গুলো তদন্ত করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।
অভিযোগের ব্যাপারে বক্তব্য জানতে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার কুলসুম সোলায়মানের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
ভাওয়াল গ্রামের শিক্ষানুরাগী ও অভিভাবকরা দ্রুত বিদ্যালয়ে একজন স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নিয়োগ, অবকাঠামোগত সমস্যার সমাধান এবং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অভিযুক্ত আব্দুর রাজ্জাকের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার জোরালো দাবি জানিয়েছেন।