প্রতিনিধি নুরুল ইসলাম নাহিদ
কালিয়াকৈর গাজীপুর।
গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার সফিপুরে বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি একাডেমিতে অঙ্গীভূত আনসার মৌলিক প্রশিক্ষণ-২০২৬-এর সমাপনী কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠিত হয়েছে। অনুষ্ঠানে আনসার বাহিনীর সক্ষমতা তুলে ধরে মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ বলেছেন, যেকোনো উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় আনসার ব্যাটালিয়ন, আনসার গার্ড ব্যাটালিয়ন ও অঙ্গীভূত আনসার সদস্যরা নিজস্ব সক্ষমতায় দায়িত্ব পালনে প্রস্তুত। সম্প্রতি গাজীপুরে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন মোকাবিলায়ও বাহিনীর এই সক্ষমতার প্রতিফলন দেখা গেছে।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি একাডেমি, সফিপুরে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে নবীন আনসার সদস্যদের সালাম ও অভিবাদন গ্রহণ করেন তিনি।
কুচকাওয়াজ পরিদর্শন শেষে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মহাপরিচালক নবীন আনসার সদস্যদের সততা, নিষ্ঠা, শৃঙ্খলা ও সর্বোচ্চ পেশাদারিত্বের সঙ্গে দেশসেবায় আত্মনিয়োগের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতি, শিল্পকারখানা ও গুরুত্বপূর্ণ কেপিআই (গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা) নিরাপত্তায় অঙ্গীভূত আনসার সদস্যরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।
মহাপরিচালক জানান, দেশের পাঁচ হাজারের বেশি সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, শিল্পকারখানা ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তায় প্রায় ৫৫ হাজারের বেশি অঙ্গীভূত আনসার সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। জাতীয় নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি ফায়ার সার্ভিসসহ অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে সমন্বিত প্রশিক্ষণ ও কার্যক্রম সম্প্রসারণের মাধ্যমে দুর্যোগ ও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাহিনীর সক্ষমতা আরও বাড়ানো হবে।
দায়িত্ব পালনকালে সরকারি সম্পদ ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে ত্যাগ স্বীকার এবং আহত হওয়া আনসার সদস্যদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি। মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ডাকাতির চেষ্টা প্রতিহত করাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে দুষ্কৃতিকারীদের অপতৎপরতা ঠেকাতে আনসার সদস্যদের সাহসিকতা ও পেশাদারিত্বের প্রশংসা করেন মহাপরিচালক।
অঙ্গীভূত আনসার সদস্যদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, সদস্যদের বেতন বৃদ্ধির প্রক্রিয়া বর্তমানে চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। ইতোমধ্যে দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত রেস্ট প্রথা বাতিল করা হয়েছে। পাশাপাশি আবাসন সুবিধার উন্নয়ন, নিজ বিভাগে বদলির সুযোগ সৃষ্টি এবং রেশন ব্যবস্থার মান ও পরিমাণ বৃদ্ধিসহ সদস্যদের জীবনমান উন্নয়নে বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে বাহিনীর সংস্কার ও সদস্যকল্যাণে নেওয়া উদ্যোগগুলো পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় দেশের প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অঙ্গীভূত আনসার সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এর ফলে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের নির্বিঘ্ন চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতেও তারা ভূমিকা রাখবেন। সদস্যদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনাকে আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করা হচ্ছে। কোনো মধ্যস্বত্বভোগী যাতে সদস্যদের প্রাপ্য অর্থ আত্মসাৎ করতে না পারে, সে বিষয়েও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
প্রশিক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরে মহাপরিচালক বলেন, বর্তমান সময়ের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অঙ্গীভূত আনসার সদস্যদের প্রশিক্ষণকে আরও যুগোপযোগী করা হয়েছে। মৌলিক প্রশিক্ষণে শারীরিক সক্ষমতা, অস্ত্র পরিচালনা, নিরাপত্তা পদ্ধতি, ইনসিডেন্ট ম্যানেজমেন্ট, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং আইন ও বিধিবিধানসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
নবীন সদস্যদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আজ থেকে তারা বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর গর্বিত সদস্য। এই পরিচয় যেমন সম্মানের, তেমনি রাষ্ট্র ও জনগণের প্রতি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বেরও প্রতীক। প্রশিক্ষণলব্ধ জ্ঞান বাস্তব কর্মক্ষেত্রে প্রয়োগ করে সততা, নিষ্ঠা, নিরপেক্ষতা, শৃঙ্খলা ও মানবিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, গত ৬ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া ৬০ দিনব্যাপী অঙ্গীভূত আনসার মৌলিক প্রশিক্ষণে অনুমোদিত ৬৯২ জন প্রশিক্ষণার্থীর মধ্যে ৬৫৪ জন অংশগ্রহণ করেন। তাঁদের মধ্যে ৬২৭ জন সফলভাবে প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেন। প্রশিক্ষণে ফায়ারে প্রথম স্থান অর্জন করেন কুমিল্লা জেলার কাজী মো. আবু সাঈদ, ড্রিলে প্রথম হন নোয়াখালী জেলার মো. ফিজুর রহমান এবং সেরা প্রশিক্ষণার্থী নির্বাচিত হন খাগড়াছড়ি জেলার মো. সাবিকুর রহমান। পরে মহাপরিচালক কৃতিত্ব অর্জনকারী প্রশিক্ষণার্থীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন।
কুচকাওয়াজের শেষ পর্যায়ে তুরস্কের জেন্ডারমেরি দলের প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের আওতায় একটি দাঙ্গা প্রতিরোধ ও নিরাপত্তা মহড়া প্রদর্শন করা হয়। মহড়ায় দাঙ্গা, বিশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার মতো পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাহিনীর প্রস্তুতি ও সক্ষমতা তুলে ধরা হয়।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর অতিরিক্ত মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মামুনূর রশীদ, আনসার ও ভিডিপি একাডেমির কমান্ড্যান্ট (অতিরিক্ত মহাপরিচালক) মো. সাইফুল্লাহ রাসেল, তুরস্ক থেকে আগত প্রশিক্ষণসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও প্রশিক্ষক এবং বাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা, কর্মচারী ও সদস্যরা।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে মহাপরিচালক প্রশিক্ষণ সফলভাবে সম্পন্ন করায় একাডেমির কমান্ড্যান্ট, প্রশিক্ষক মণ্ডলী, কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানান। একই সঙ্গে নবীন আনসার সদস্যদের কর্মজীবনের সাফল্য, সুস্বাস্থ্য ও নিরাপদ জীবন কামনা করেন।