শিবচর উপজেলা প্রতিনিধি (মাদারীপুর)
জাতীয় সম্পদ মা ইলিশ রক্ষায় এবং সরকারের দেওয়া প্রজনন ও নিষেধাজ্ঞা সফল করতে মাদারীপুরের শিবচরে পদ্মা নদীতে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করেছে উপজেলা প্রশাসন। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত পদ্মার বিভিন্ন পয়েন্টে এই যৌথ অভিযান পরিচালিত হয়। অভিযানে প্রায় ৩ লাখ মিটার অবৈধ কারেন্ট জাল জব্দ করে তা প্রকাশ্যে ধ্বংস করা হয়েছে। একই সঙ্গে ইলিশ শিকারের অভিযোগে ৯ জন জেলেকে আটক করে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড প্রদান করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত।
প্রশাসনের এমন কঠোর পদক্ষেপে পদ্মাপাড়ের অসাধু জেলে চক্রের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, প্রজনন মৌসুমে ইলিশের অবাধ ডিম ছাড়ার সুযোগ নিশ্চিত করতে এই ধরনের বিশেষ অভিযান অব্যাহত থাকবে।
মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযানের অংশ হিসেবে গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত শিবচর উপজেলার বিভিন্ন নদী তীরবর্তী ও দুর্গম চরাঞ্চলে এই অভিযান চালানো হয়। তবে প্রশাসনের তৎপরতা কেবল এই সময়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। অভিযানের নেতৃত্বদানকারী শিবচর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) এইচ এম ইবনে মিজান জানান, সকাল থেকে শুরু হওয়া এই অভিযান একটানা চলছে এবং মধ্যরাতের পর পরবর্তী শিফটের আরেকটি টিম পরদিন ফজর পর্যন্ত নদী পাহারা ও টহল অব্যাহত রাখে।
সার্বক্ষণিক নজরদারির ফলে অসাধু চক্র নদী এলাকায় টিকতে পারেনি।
এই বিশেষ ও সফল অভিযানে সরাসরি নেতৃত্ব দেন শিবচর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) এইচ এম ইবনে মিজান। প্রশাসনের সার্বিক কার্যক্রমে তাকে জোরালোভাবে সহযোগিতা করেন শিবচর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো: নাসির উদ্দিন এবং শিবচর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সত্যজিৎ মজুমদার। এছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয় শিবচর থানা পুলিশ এবং চরজানাজাত নৌ-পুলিশের একটি চৌকস দল। স্থানীয় প্রশাসন, মৎস্য বিভাগ ও পুলিশের এই সম্মিলিত প্রয়াসই অল্প সময়ে বড় ধরনের সাফল্য এনে দেয়।
অভিযানের সময় পদ্মা নদীর বিভিন্ন গোপন আস্তানা ও জলপথ থেকে নিষিদ্ধ ঘোষিত ৩ লাখ মিটার (৩ লক্ষ ঘনমিটার) কারেন্ট জাল জব্দ করা হয়। পরে প্রশাসনের উপস্থিতিতে নদী তীরবর্তী নিরাপদ স্থানে এসব জাল আগুনে পুড়িয়ে পুরোপুরি ধ্বংস করা হয়। নদীর বুকে ইলিশ শিকার করার সময় হাতেনাতে আটক করা হয় ৯ জন জেলেকে। অপরাধের মাত্রা বিবেচনা করে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে তাদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। প্রশাসনের এই তাৎক্ষণিক বিচার কার্যক্রম অপরাধীদের মনে কড়া বার্তা পৌঁছে দিয়েছে।
অভিযান শেষে শিবচর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) এইচ এম ইবনে মিজান সাংবাদিকদের জানান:
আমরা আজকে সন্ধ্যা থেকে আমাদের নৌ-পুলিশ, উপজেলা প্রশাসন ও মৎস্য বিভাগ সবাই সম্মিলিতভাবে অভিযান পরিচালনা করেছি। সকাল থেকে এখন পর্যন্ত অভিযান চলছে এবং এর ধারাবাহিকতায় আমাদের আরেকটি শিফট এখন থেকে ফজর পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করবে। আজকের এই অভিযানে আমরা প্রায় ৩ লক্ষ মিটার জাল পেয়েছি এবং ৯ জনকে আটক করে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড প্রদান করেছি। আমাদের এই অভিযানের পরবর্তীতে আরেকটি টিম মাঠে নামছে। নিষিদ্ধ সময়ে পদ্মায় মা ইলিশ রক্ষায় আমাদের এই অভিযান অব্যাহত থাকবে।
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সত্যজিৎ মজুমদার জানান, মা ইলিশ আমাদের জাতীয় অর্থনীতি ও সমুদ্র সম্পদ সুরক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রজনন সময়ে মা ইলিশ সঠিকভাবে ডিম ছাড়তে পারলে আগামীতে ইলিশের উৎপাদন বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু কিছু অসাধু ও লোভী জেলে সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মা ইলিশ নিধনে লিপ্ত হয়। তাদের প্রতি কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না।
শিবচর উপজেলার চরাঞ্চল ও নদী তীরবর্তী এলাকার মানুষের জীবনজীবিকা বহুলাংশে পদ্মা নদীর ওপর নির্ভরশীল। তবে সচেতন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা প্রশাসনের এই সময়োপযোগী ও কঠোর পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। তাদের মতে, অতীতে কিছু প্রভাবশালী চক্রের ছত্রছায়ায় মা ইলিশ শিকার চললেও বর্তমান প্রশাসনের জিরো টলারেন্স নীতির কারণে নদী রক্ষা পাওয়া সহজ হচ্ছে। স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, সাময়িক এই কড়াকড়ি জেলেরাও পরবর্তীতে বুঝতে পারবেন যে মা ইলিশ রক্ষা পেলে পরবর্তীতে জাটকা ও বড় ইলিশ বিক্রির মাধ্যমে তারা আর্থিকভাবে লাভবান হবেন।
প্রশাসন সূত্র জানিয়েছে, প্রজনন মৌসুমের শেষ দিন পর্যন্ত শিবচরের পদ্মা নদীতে ২৪ ঘণ্টার রোটেশনভিত্তিক পাহারা ও মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হবে। নদীপথে যে কোনো ধরনের অবৈধ জালের ব্যবহার রোধে চরজানাজাত ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে নৌ-পুলিশের টহল আরও জোরদার করা হয়েছে। এছাড়া জেলেদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি যারা আইন অমান্য করবে, তাদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা ও জেল-জরিমানা অব্যাহত থাকবে।