নিতিশ চন্দ্র বর্মন পঞ্চগড় জেলা প্রতিনিধি:
সারাদেশের ন্যায় পঞ্চগড়ের আটোয়ারীতে আনন্দ, উচ্ছ্বাস আর বিদায়ের করুণ সুরের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। টানা পাঁচ দিনের পূজা-অর্চনার ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে বিজয়া দশমীতে জলাশয়ে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে মর্ত্যলোক ছেড়ে কৈলাসে পতিগৃহে ফিরে গেছেন দেবী দুর্গা। সেই সঙ্গে সমাপ্তি ঘটেছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের এই সর্ববৃহৎ শারদোৎসবের। একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, আটোয়ারী উপজেলায় মোট ৩০টি দুর্গামণ্ডপ নির্মিত হয়েছিল। এর মধ্যে বুধবার (২১ অক্টোবর) বিকেলে বিভিন্ন জলাশয়ে পৃথক পৃথকভাবে আটোয়ারী কেন্দ্রীয় দুর্গামণ্ডপের প্রতিমাসহ ২৩টি মণ্ডপের দেবী দুর্গার প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়। পরবর্তীতে বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) বিকেলে উপজেলার ঐতিহ্যবাহী মির্জাপুর নুনুমণ্ডল হাট দুর্গামণ্ডপের প্রতিমাসহ অবশিষ্ট ৭টি মণ্ডপের দেবী দুর্গার প্রতিমাগুলো বিভিন্ন জলাশয়ে বিসর্জনের মাধ্যমে সম্পূর্ণ পূজার আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়। বিজয়া দশমীর সকালে মণ্ডপে মণ্ডপে দেবীর দর্পণ বিসর্জন ও বিহিত পূজা সম্পন্ন করেন পুরোহিতরা। জনৈক পুরোহিত জানান, বিজয়া দশমীর দিনে দর্পণ বিসর্জন, বিহিত পূজা, সিঁদুর খেলা এবং শোভাযাত্রার মাধ্যমে দেবী দুর্গাকে কৈলাসে স্বামীর গৃহে বিদায় জানানো হয়। সকালে দেবীর প্রতিমার সামনে আয়নায় রূপ প্রতিবিম্ব ফেলে বিসর্জনের বিশেষ পূজা শেষ হলে মণ্ডপে মণ্ডপে নেমে আসে ভক্তদের ঢল। মণ্ডপ ও মন্দিরগুলোতে বিজয়ার প্রধান আচারে অংশ নেন নারীরা। দেবীর চরণে সিঁদুর নিবেদন করে তাঁরা শক্তির প্রতি শ্রদ্ধা জানান এবং এরপর একে অপরের গায়ে সিঁদুর মেখে দেবীর কাছে পরিবারের সুখ ও জীবনের সমৃদ্ধি কামনা করেন। ঢাকের বাদ্য, কাঁসর-ঘণ্টার ধ্বনি আর বিজয়ার শুভেচ্ছার মধ্য দিয়ে প্রতিমা নদী ও জলাশয়ে বিসর্জন দেওয়া হয়। বিসর্জন শেষে ভক্তরা একে অপরকে মিষ্টিমুখ করান এবং প্রবীণ ও গুরুজনদের প্রণাম করে আশীর্বাদ গ্রহণ করেন।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, মানুষের মনের আসুরিক প্রবৃত্তিকাম, ক্রোধ, হিংসা ও লালসা বিসর্জন দেওয়াই বিজয়া দশমীর মূল তাৎপর্য। এসব কুপবৃত্তি বিসর্জন দিয়ে একে অপরের সঙ্গে প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা করাই এ আয়োজনের মূল লক্ষ্য। আটোয়ারী কেন্দ্রীয় পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি মনোজ রায় হিরু বলেন "আমরা ভারাক্রান্ত হৃদয়ে দুর্গা মাকে বিদায় জানালাম। মা আমাদের মঙ্গলের জন্য এবং অশুভ শক্তির বিনাশে ধরাধামে এসেছিলেন। আমরা মায়ের কাছে একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ চাই, যাতে কোনো অশুভ শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে। সমাজ থেকে সব অন্যায়-অপরাধ দূর হোক। আগামীতে দেশ যেন সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হয় এবং সব মানুষের মঙ্গল হয় এটাই মায়ের কাছে আমাদের মূল প্রার্থনা।সাধারণ সম্পাদক গণেষ চন্দ্র ঘোষ ভানু বলেন দুর্গাপূজার সূচনা থেকে শুরু করে প্রতিমা বিসর্জন পর্যন্ত সমগ্র উপজেলায় ছিল কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টনী। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বিসর্জন কার্যক্রম শেষ না হওয়া পর্যন্ত কয়েক স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার রাখা হয়।এবারের দুর্গা মণ্ডপগুলোর নিরাপত্তায় পর্যাপ্ত আনসার বাহিনীর পাশাপাশি ছিল পুলিশের সার্বক্ষণিক টহল দল, ফায়ার সার্ভিস, পোশাকধারী ও সাদা পোশাকের পুলিশ এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা। মণ্ডপ কর্তৃপক্ষ নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবক দল দিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছেন এবং প্রতিটি মণ্ডপ এলাকা সিসিটিভি ক্যামেরা দিয়ে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে।
পূজামণ্ডপগুলো সার্বক্ষণিক তদারকি ও পরিদর্শন করেছেন আটোয়ারী উপজেলা নির্বাহী অফিসার নিরুপমা রায়, সহকারী কমিশনার (ভূমি) প্রশান্ত কুমার, আটোয়ারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মতিয়ার রহমানসহ একাধিক ম্যাজিস্ট্রেট। এছাড়া পঞ্চগড়ের জেলা প্রশাসক মোসা. শুকরিয়া পারভীন এবং পুলিশ সুপার মো. আবু সাইম সরজমিনে দুর্গা মণ্ডপগুলো পরিদর্শন করে সার্বিক সার্বিক পরিস্থিতির খোঁজখবর নেন।