কক্সবাজারের উখিয়া ফরেস্ট রেঞ্জের অধীনস্থ সংরক্ষিত বনভূমি উদ্ধারে বন বিভাগের সাম্প্রতিক একটি উচ্ছেদ অভিযান নিয়ে সাধারণ মানুষ ও স্থানীয় মহলে তীব্র ক্ষোভ ও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, গতকালকের এই অভিযানটি ছিল মূলত একটি 'আইওয়াশ' বা লোকদেখানো নাটক।
উচ্ছেদকৃত জায়গায় কোনো ধরনের স্থায়ী সীমানা প্রাচীর (বাউন্ডারি) বা সাইনবোর্ড না টাঙিয়ে বন বিভাগ স্থান ত্যাগ করায় অভিযানের সততা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, অভিযানের নামে কিছু ঘর আংশিক ভাঙা হলেও বেশিরভাগই অক্ষত রেখে চলে গেছেন কর্মকর্তারা।
এসিএফ বদলি হতেই পুরনো চেহারায় রেঞ্জ কর্মকর্তা!
স্থানীয় সাধারণ মানুষের অভিযোগ, উখিয়া ফরেস্ট রেঞ্জ কর্মকর্তা জনাব আব্দুল মান্নানের প্রত্যক্ষ মদদে বনের জমিতে অবৈধ ঘরবাড়ি নির্মাণের এক বিশাল বাণিজ্য গড়ে উঠেছে। টাকা দিলে ঘর তুলতে দেওয়া এবং টাকা না দিলে বনের আইন দেখানোর এক অভিনব কৌশল চালাচ্ছেন তিনি।
এর আগে তার বিরুদ্ধে ওঠা ব্যাপক অনিয়ম ও ঘুষ বাণিজ্যের লাগাম টানতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ একজন সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ)-কে দায়িত্ব দিয়ে এখানে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু সম্প্রতি ওই এসিএফ অন্য জায়গায় বদলি হয়ে যাওয়ায় রেঞ্জ কর্মকর্তা পুনরায় তার পুরনো বাণিজ্য শুরু করেছেন।
নিজেদের আধিপত্য ও চাঁদাবাজির ধারাবাহিকতা বজায় রাখতেই তড়িঘড়ি করে এই লোকদেখানো উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে বলে জনমনে গুঞ্জন রয়েছে।
'কালা সোনা' সিন্ডিকেটের চাঁদাবাজি ও বৈষম্য অনুসন্ধানে জানা যায়, রেঞ্জ কর্মকর্তার এই চাঁদাবাজি মিশন সফল করতে মাঠ পর্যায়ে কাজ করছে 'কালা সোনা' নামক একটি শক্তিশালী স্থানীয় দালাল চক্র। কোনো সাধারণ মানুষ মাথা গোঁজার ঠাঁই হিসেবে বনের জমিতে একটু ঘর তুলতে গেলেই এই চক্রটি মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করে। দাবি করা টাকা না পেলেই বন বিভাগকে ডেকে এনে চালানো হয় উচ্ছেদ অভিযান।
অথচ উখিয়ায় বছরের পর বছর ধরে শত শত একর বনভূমি সাধারণ মানুষ বসবাস এটা প্রশাসন সহ সবাই অবগত।
এছাড়া বন বিভাগ গা-ছাড়া ভাব নিয়ে দিন কে দিন উন্মুক্ত ফেলে রাখেদ আজ পর্যন্ত সেসব জায়গায় কোনো নির্দিষ্ট সীমানা প্রাচীর বা সরকারি মালিকানার সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেয়নি। ফলে সাধারণ মানুষ না জেনেই বনের জমিতে বসতি গড়ছে এবং পরবর্তীতে এই দালাল চক্র ও অসাধু কর্মকর্তাদের বলির পাঁঠা হচ্ছে।
গতকালকের এই আংশিক উচ্ছেদ অভিযানের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে (সোশ্যাল মিডিয়া) নেটিজেনদের মধ্যে ব্যাপক সমালোচনা ও ক্ষোভের ঝড় বয়ে যাচ্ছে। সচেতন নাগরিকেরা মন্তব্য করছেন, উখিয়ার বিস্তীর্ণ সংরক্ষিত বনভূমি উজাড় করে লাখ লাখ রোহিঙ্গা বছরের পর বছর ধরে বসবাস করতে পারলে, এ দেশের ভূমিহীন নাগরিকেরা কেন মাথা গোঁজার ঠাঁই পাবে না? কেন শুধু দেশি ও অসহায় মানুষের ওপরই বন বিভাগের এই আংশিক আইনের তলোয়ার চালানো হয়?
বনের জমিতে বড় বড় ইন্ডাস্ট্রি: মাসোহারার অঙ্ক লাখের ওপর!
সবচেয়ে বড় চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, যে সংরক্ষিত বনের জমিতে সাধারণ মানুষের বসতি ভাঙা হচ্ছে, সেই একই রিজার্ভ ফরেস্টের শত শত একর জায়গা দখল করে গড়ে উঠেছে বড় বড় শিল্প কারখানা। স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যমতে— উখিয়া আমগাছতলা মাইশা ইন্ডাস্ট্রি, পুষ্টি শিশু খাদ্য কুতুপালং পর্যন্ত অসংখ্যা ইন্ডাস্ট্রি-সহ বেশ কিছু বড় বড় কলকারখানা সম্পূর্ণ অবৈধভাবে বনের জমিতে অবস্থান করছে।
নিয়ম অনুযায়ী সংরক্ষিত বনাঞ্চলে কোনোভাবেই পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র কিংবা বিদ্যুৎ সংযোগ পাওয়ার কথা নয়। কিন্তু অলৌকিকভাবে এই সমস্ত বড় বড় ইন্ডাস্ট্রি বহাল তবিয়তে বিদ্যুৎ ব্যবহার করে উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এই কারখানাগুলো টিকিয়ে রাখতে উখিয়া ফরেস্ট রেঞ্জ কর্মকর্তা প্রতি মাসে ১ লক্ষ টাকারও বেশি মাসোহারা বা অবৈধ সুবিধা গ্রহণ করে আসছেন।
অভিযানের নামে এই প্রহসন এবং মাসোহারা বাণিজ্যের বিষয়ে উখিয়া ফরেস্ট রেঞ্জ কর্মকর্তার কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি সুনির্দিষ্ট প্রশ্নগুলো কৌশলে এড়িয়ে যান। তবে তিনি দাবি করেন, গতকালকের অভিযানে প্রায় ৭ একরের মতো বনভূমি উদ্ধার করা হয়েছে এবং বনের জমি রক্ষায় তাদের এই অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।
উখিয়ার সচেতন মহল মনে করেন, এই ধরনের আংশিক ও লোকদেখানো অভিযান রাষ্ট্র বা বন বিভাগ—কারো কোনো কল্যাণে আসবে না। বনের জমি উদ্ধার করতে হলে দালাল চক্রের মূলোৎপাটন করতে হবে এবং সাধারণ মানুষের পাশাপাশি বনের জমি দখলকারী বড় বড় শিল্প কারখানার বিরুদ্ধেও সমভাবে আইন প্রয়োগ করতে হবে। অন্যথায় বন রক্ষার এই মিশন কেবলই 'চাঁদাবাজির মেসেজ' হিসেবেই গণ্য হবে।