কক্সবাজারের উখিয়ায় অপহরণের দীর্ঘ প্রায় তিন মাস (৮৬ দিন) পর মুমূর্ষু অবস্থায় উদ্ধার হয়েছে দশম শ্রেণির মেধাবী স্কুলছাত্র মাছুদ মোহাম্মদ আরবিত (১৫)। তাকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ভর্তি করা হয়েছে। দীর্ঘদিন অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বন্দি রেখে তার ওপর অমানবিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়। এই ঘটনায় মামলার এজাহারনামীয় এক আসামিকে গ্রেপ্তার করে দুই দফা রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ।
নিখোঁজ ও অপহরণের প্রেক্ষাপট
উখিয়ার রত্নাপালং ইউনিয়নের জাফরপল্লান পাড়ার সিএনজি চালক আফাজ উদ্দিন ও এনজিও কর্মী কাজল আকতারের ছেলে আরবিত। সে আবুল কাশেম নুরজাহান চৌধুরী উচ্চ বিদ্যালয়ের কারিগরি (বিজ্ঞান) বিভাগের ছাত্র।
গত ১৫ জুন ২০২৬ তারিখে বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে কোটবাজার এলাকা থেকে তাকে কৌশলে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তুলে অপহরণ করা হয়। এই ঘটনায় আরবিতের মা বাদী হয়ে উখিয়া থানায় একটি অপহরণ মামলা দায়ের করেন।
দুই চক্রের হাতবদল ও বন্দিশালার লোমহর্ষক বর্ণনা তদন্তে জানা গেছে, অপহরণের পর আরবিতকে কক্সবাজার শহরে নিয়ে আসা হয়। মূল অপহরণকারী চক্রের সদস্য—উখিয়ার রুমখাঁ হাতির ঘোনার সেলিম এবং রত্না পালং গ্রামের ইব্রাহিম ও তার ভাই মাসুদ। এর মধ্যে ইব্রাহিম ঘটনার পরপরই কাতারে পালিয়ে গেছে। সেলিম বর্তমানে পুলিশ হেফাজতে কারাগারে রয়েছে, যাকে আন্তর্জাতিক অপহরণ চক্রের সদস্য বলে সন্দেহ করছে পুলিশ।
সেলিমের দল কক্সবাজারে এনে আরবিতকে দ্বিতীয় আরেকটি অপরাধী দল 'শাকিল গ্রুপ'-এর হাতে তুলে দেয়।
শাকিল গ্রুপ তাকে একটি ৩-৪ তলা ভবনের গোপন কক্ষে আটকে রাখে। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আরবিত জানায়, সেখানে প্রতিদিন তাকে মাত্র একবেলা খাবার দেওয়া হতো। সবচেয়ে অমানবিক বিষয় হলো, মুক্তি দেওয়ার আগে টানা আট দিন তাকে সম্পূর্ণ অভুক্ত রাখা হয়েছিল।
আরো জানা গেছে অপহরণকারী সমকামী, হিজড়া বানানোর কাজে জড়িত।
অবশেষে গত ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ (মঙ্গলবার) সকালে অপহরণকারীরা আরবিতের মুখে কাপড় বেঁধে গাড়িতে করে কয়েক ঘণ্টার রাস্তা পাড়ি দিয়ে উখিয়ার একটি নির্জন স্থানে চলন্ত গাড়ি থেকে ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে স্থানীয় জনতা তাকে উদ্ধার করে দ্রুত কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নিয়ে যান।
চিকিৎসকদের বক্তব্য ও বর্তমান অবস্থা
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিনের অনাহার ও পাশবিক নির্যাতনের কারণে কিশোর আরবিত মারাত্মক পুষ্টিহীনতা, শারীরিক দুর্বলতা এবং তীব্র মানসিক ট্রমার (আতঙ্ক) শিকার হয়েছে। বর্তমানে তার শারীরিক অবস্থা আশঙ্কামুক্ত তবে তাকে চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
পুলিশের তদন্ত ও আইনি অগ্রগতি
উখিয়া থানা পুলিশ জানিয়েছে, মামলার প্রধান আসামি সেলিমকে ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মূল রহস্য উদঘাটনের লক্ষ্যে আদালত তার দুই দফার রিমান্ড মঞ্জুর করেন। উখিয়া থানার তদন্তকারী কর্মকর্তা জানান, আসামির কাছ থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে।
অপহরণের মূল আস্তানা এবং এর নেপথ্যে থাকা মূলহোতা ও শাকিল গ্রুপের বাকি সদস্যদের চিহ্নিত করতে পুলিশের একাধিক টিম মাঠে কাজ করছে।
জনমনে ক্ষোভ ও স্থানীয়দের দাবি
একজন কিশোর ছাত্রকে দীর্ঘ সময় আটকে রেখে এমন নৃশংস নির্যাতনের ঘটনায় উখিয়াবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। স্থানীয় সচেতন মহল অপরাধীদের রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয় বিবেচনা না করে দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। একই সাথে তারা আরবিতের উন্নত চিকিৎসা, পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং ভবিষ্যতে উখিয়ায় এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।