নেতা বদলেছে, বদলায়নি কারবার! কসবার ইউপি সদস্যকে ঘিরে অস্ত্র-মাদক ও চোরাচালানের অভিযোগ।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার বায়েক ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আলমগীর হোসেনকে ঘিরে অস্ত্র ব্যবসা, মাদক ও ভারতীয় চোরাচালানের নানা অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগগুলোর বিষয়ে সম্প্রতি তদন্তে নেমেছে ব্রাক্ষণবাড়ীয়া ও কুমিল্লা জেলা গোয়েন্দা শাখা গুলো।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও সীমান্তকেন্দ্রিক অবৈধ ব্যবসার সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা বন্ধ হয়নি। আগে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা রেখে ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগ থাকলেও বর্তমানে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণে বিভিন্ন নেতার সঙ্গে যোগাযোগ রেখে একই ধরনের কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ইউপি সদস্য আলমগীর হোসেন।
জানা গেছে, আলমগীর হোসেন কসবার চারুয়া গ্রামের মৃত ফরিদ আলীর ছেলে। স্থানীয়ভাবে তিনি আওয়ামী লীগের সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান জীবন ও বায়েক ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের নেতা আজমলের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন বলে স্থানীয়দের দাবি।
চোরাচালানের অভিযোগ
সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দা হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে ভারতীয় চোরাই পণ্যের ব্যবসার সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, তার বাড়িতে ভারতীয় চিনির গোডাউন রয়েছে। চিনি পরিবহনে নিজস্ব দুটি ট্রাকসহ ভাড়ায় আরও কয়েকটি ট্রাক ব্যবহার করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, বিজিবির নিলাম থেকে ভারতীয় চিনি কেনার পাশাপাশি চোরাইপথে আসা চিনিও দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হয়। সম্প্রতি মাদক ও চোরাই পণ্যের পাশাপাশি অবৈধ অস্ত্রের ব্যবসার সঙ্গেও তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ সামনে এসেছে।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার দাবি, সীমান্তের ওপারের বিভিন্ন গ্রুপের কাছ থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করে একটি চক্রের মাধ্যমে সেগুলো দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হয়। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
সম্পদের মালিক হওয়া নিয়েও প্রশ্ন
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, ভারতীয় চিনি ব্যবসার বাইরে তার দৃশ্যমান বড় কোনো ব্যবসা না থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। কুমিল্লা নগরীর রামঘাটলা এলাকায় রোবাস্ট লাইফ হাসপাতাল প্রাইভেট লিমিটেড নামে একটি বেসরকারি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার কাজ চলছে বলেও জানা গেছে।
স্থানীয়দের দাবি, হাসপাতালটিতে তার বড় ধরনের বিনিয়োগ রয়েছে এবং তিনি প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান। এছাড়া বিলাসবহুল গাড়িতে চলাচল নিয়েও এলাকায় আলোচনা রয়েছে।
অস্ত্রের ছবি ছড়িয়ে পড়ায় চাঞ্চল্য
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলমগীর হোসেনের হাতে বিদেশি অস্ত্র রয়েছে—এমন কয়েকটি ছবি ছড়িয়ে পড়ে। এসব ছবি ঘিরে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।
স্থানীয় এক ব্যক্তি অভিযোগ করেন, বিভিন্ন সময়ে অস্ত্রের সম্ভাব্য ক্রেতাদের ভিডিও কলের মাধ্যমে অস্ত্র দেখানো হতো এবং পরবর্তীতে চোরাই পণ্যের চালানের আড়ালে সেগুলো সরবরাহ করা হতো। তবে এই অভিযোগেরও স্বাধীন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ব্রাক্ষণবাড়ীয়া ও কুমিল্লা জেলা গোয়েন্দা সংস্থা বলেন, আলমগীর হোসেন অস্ত্র ব্যবসা ও চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত—এমন তথ্য তাদের কাছে এসেছে। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে এবং গোয়েন্দা শাখার একাধিক টিম কাজ করছে।
অভিযোগ অস্বীকার ইউপি সদস্যের
সব অভিযোগ অস্বীকার করে ইউপি সদস্য আলমগীর হোসেন বলেন, “অস্ত্র কী জিনিস আমি কেন, আমার বাবাও চেনে না। একটি চক্র ষড়যন্ত্র করে অস্ত্রের ছবি এডিট করে বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে দিয়েছে। এসব ছবি দেখিয়ে আমার কাছ থেকে ৩০-৪০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “আমি ভারতীয় চিনির ব্যবসা করি। বিজিবির নিলাম থেকে চিনি কিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করি। আমি কোনো ধরনের চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত নই।”
আলমগীর জানান, ছবি ছড়িয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনায় তিনি কয়েকজনের বিরুদ্ধে কসবা থানায় মামলা করেছেন।
অভিযোগের সত্যতা তদন্তেই নির্ধারিত হবে। তবে একজন জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে অস্ত্র ও চোরাচালানের মতো গুরুতর অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এখন ডিবির তদন্তে এসব অভিযোগের সত্যতা কতটা, সেটিই দেখার বিষয়।