পদ্মা সেতু হয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার প্রবেশদ্বার ফরিদপুরের ভাঙ্গায় সড়ক দুর্ঘটনা যেন নিত্যদিনের আতঙ্কে পরিণত হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত মাত্র আট মাসে উপজেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৫০ থেকে ৬০টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় অন্তত ৫২ জন নিহত এবং প্রায় ৩০ জন আহত হয়েছেন।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়, নিহতদের বড় একটি অংশই তরুণ। এর মধ্যে গত এক সপ্তাহেই মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন আট যুবক। আগস্ট মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১১ জন। এর আগে জুলাইয়ে ৬ জন, জুনে ৮ জন এবং মে মাসে ৯ জন নিহত হন। অর্থাৎ মে থেকে আগস্ট—এই চার মাসেই সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে ৩৩ জনের।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিলে ৮ জন, মার্চে ৬ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৩ জন এবং জানুয়ারিতে ২ জন নিহত হয়েছেন। সব মিলিয়ে বছরের প্রথম আট মাসে ভাঙ্গায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫২ জনে।
বেপরোয়া গতি ও যানবাহনের চাপে বাড়ছে ঝুঁকি
স্থানীয়দের মতে, ভাঙ্গায় সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ বেপরোয়া গতি। এর সঙ্গে রয়েছে অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ, মহাসড়কে অবৈধ থ্রি-হুইলারের চলাচল এবং মোটরসাইকেল ও মালবাহী ট্রাকের অতিরিক্ত গতি।
পদ্মা সেতু চালুর পর ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে হয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার যানবাহন চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এতে ভাঙ্গা দেশের অন্যতম ব্যস্ত সড়ক যোগাযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। বিপুলসংখ্যক যানবাহনের চাপের পাশাপাশি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, সেতু ও কালভার্টের সংকীর্ণতা দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
ভাঙ্গা-বরিশাল মহাসড়কেও এখনও দুই লেনের চারটি সেতু রয়েছে। এসব সেতুর কয়েকটি এলাকায় দুর্ঘটনার প্রবণতা তুলনামূলক বেশি বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। বিশেষ করে বাবনতলা, সরু ও চাপা সেতু এলাকায় প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
মানা হচ্ছে না ট্রাফিক আইন
স্থানীয়দের অভিযোগ, মহাসড়কে অনেক থ্রি-হুইলার চালক ট্রাফিক আইন না মেনে বেপরোয়াভাবে চলাচল করেন। পাশাপাশি মোটরসাইকেল ও পণ্যবাহী যানবাহনের অতিরিক্ত গতিও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। এতে একের পর এক প্রাণহানির পাশাপাশি নিঃস্ব হচ্ছে অনেক পরিবার।
ভাঙ্গা হাইওয়ে থানা পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে ভাঙ্গায় প্রায় ৫০টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৫২ জন নিহত এবং অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন।
পুলিশের বক্তব্য
এ বিষয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ভাঙ্গা সার্কেল) রেজওয়ান দীপু বলেন,"দক্ষিণাঞ্চলের প্রবেশদ্বার ভাঙ্গার ওপর দিয়ে বিপুলসংখ্যক যানবাহন চলাচল করায় সড়কে যানবাহনের চাপ বেশি থাকে। এ কারণে মাঝেমধ্যে দুর্ঘটনা ঘটে"।
তিনি আরও বলেন,"সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে জেলা পুলিশ ও হাইওয়ে পুলিশের সমন্বয়ে কাজ করা হচ্ছে। দুর্ঘটনা প্রতিরোধেও বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে"।
প্রশস্ত সড়ক ও কঠোর আইন প্রয়োগের দাবি
সংশ্লিষ্টদের মতে, ভাঙ্গা হাইওয়ে ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক প্রশস্ত করার পাশাপাশি সংকীর্ণ সড়ক, সেতু ও কালভার্টগুলো দ্রুত প্রশস্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে মহাসড়কে অবৈধ থ্রি-হুইলার, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও ভ্যানের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
এ ছাড়া চালকদের বেপরোয়া গতি নিয়ন্ত্রণ, ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন এবং নিয়মিত অভিযান পরিচালনার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাদের আশা, এসব পদক্ষেপ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে ভাঙ্গায় সড়ক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির সংখ্যা অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।