নওগাঁয় অনুমতি বিহীন ছোলে সিএফ-৩এল (ঈযড়ষব ঈঋ-৩খ) নামক একটি ঔষধ প্রেসক্রিপশন করে রোগীর হাতে ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। নেই ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের অনুমোদন নম্বর। এমনকি বাজারমূল্যও (এমআরপি) সাদা কাগজে লেখা হয়েছে ৪০০টাকা। অভিযোগ ডা: মো: মাহবুবুর রহমান নামের এক ডাক্তারের প্রেসক্রিপশনে সিল মেরে ওই ঔষধটি দেদারছে লেখা হচ্ছে।
অথচ এই পণ্যটি বাংলাদেশে কোন আমদানিকারকের মাধ্যমে এসেছে, তারও কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
শুধু এই ঔষধই নয়, হারবালের জিক্যাপ ক্যাপসুল (ঈধঢ়. তবপধঢ়) এবং ঠড়ষরমবষ গধী নামের আরও দুটি ঔষধ সিল মেরে নিয়মিত প্রেসক্রিপশনে লেখার অভিযোগ উঠেছে ওই ডাক্তারের প্রেসক্রিপশনে। এই দুটি ঔষধ নিয়েও রয়েছে সন্দেহ। ফলে ওষুধের গুণগত মান নিয়ে দেখা দিয়েছে প্রশ্ন। এছাড়া প্রায় প্রতিটি রোগীকে একই রকমের বেশ কিছু টেস্ট দেওয়া তো ওপেন সিক্রেট।
আরও গুরুতর অভিযোগ হলো-ডাক্তারের পাশে বসে রোগীদের প্রেসক্রিপশনে বিভিন্ন ঔষধ লিখে দিচ্ছেন মাহফুজ নামের এক ব্যক্তি। তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত বলে দাবী করেন ডাক্তার মাহবুবুর রহমান। ডাক্তার রোগী দেখে ঔষধের নাম বলার পর মাহফুজ তা লিখে দিচ্ছেন। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে মাহফুজ নিজেও ঔষধের নাম মনে করিয়ে দিচ্ছেন। ডাক্তার সম্মতি দিলে সেটি প্রেসক্রিপশনে যুক্ত হচ্ছে। এভাবে একাধিক প্রেসক্রিপশন লেখার দৃশ্য সরেজমিনে প্রত্যক্ষ করা হয়েছে হলিপ্যাথ ডিজিটাল ডায়াগনস্টিক ল্যাবে গিয়ে।
অভিযোগ রয়েছে, ছোলে সিএফ-৩এল (ঈযড়ষব ঈঋ-৩খ) ও জিক্যাপ ক্যাপসুল (ঈধঢ়. তবপধঢ়) বাজারজাতকরণের সঙ্গে ওই মাহফুজ জড়িত। ফলে রোগী দেখার পাশাপাশি প্রেসক্রিপশন লেখা এবং ঔষধের বাজারজাতকরণ-এই বিষয়কে ঘিরে তৈরি হয়েছে গুরুতর প্রশ্ন।
জানা যায়, নওগাঁ শহরের কাজীর মোড়ে হলিপ্যাথ ডিজিটাল ডায়াগনস্টিক ল্যাবে প্রতি শুক্রবার রোগী দেখেন ডা. মো. মাহবুবুর রহমান। তিনি সিরাজগঞ্জ শহীদ এমএ মনসুর আলী মেডিক্যাল কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান হিসেবে আছেন বলে তাঁর নেমপ্লেটে দেখা যায়। এছাড়া সেখানে লেখা আছে এমডি (নিউরোমেডিসিন)। অথচ তাঁর কাছে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের শতকরা প্রায় ৮০% প্রেসক্রিপশনে রয়েছে ঈযড়ষব ঈঋ-৩খ নামের ভিটামিন ডি-৩ ইনজেকশন আইপি নামক অনুমিত বিহীন ঔষধ।
ঘাড়ের ব্যথার চিকিৎসা নিতে ডাক্তারের কাছে যান জেলার রাণীনগর উপজেলার সুনিতা রাণী প্রামানিক। সিরিয়ালের ৮০০টাকা পরিশোধ করতে হয়। প্রথমেই এক্স-রে, সিবিসিসহ কয়েকটি পরীক্ষা করতে দেওয়া হয়। এরপর প্রেসক্রিপশনে অন্যান্য ঔষধের সঙ্গে ঈযড়ষব ঈঋ-৩খ লিখে দেওয়া হয়। এটি হাফ গ্লাস গরম দুধের সঙ্গে মিশিয়ে সেবন করতে বলা হয়। ২১ দিন পর একই নিয়মে আরও দুটি ঔষধ সেবন করার পরামর্শ দেওয়া হয় প্রেসক্রিপশনে।
সুনিতা রাণী অভিযোগ করে বলেন, ‘দুধের সাথে ঔষধটি খাওয়ার পর আমার খুব কষ্ট হয়েছিল। খুব গ্যাস হয়েছিল। গলার মধ্যে হাত ঢুকিয়ে বমি করতে হয়েছে। দুই রাত ঘুমাতে পারিনি। প্রায় এক সপ্তাহ কিছু খেতে পারিনি। আমি আর ওই ঔষধ খাব না।’
তবে ওই অসুস্থতার সঙ্গে ওষুধটির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
সেবা নিতে আসা আজাহার আলী নামের এক ব্যক্তি বলেন, অসুখ ভালো হওয়ার জন্য আমরা ডাক্তারের কাছে আছি। পড়াশোনা জানিনা। ডাক্তার যেটা লিখে দিবে সেটাই বিশ্বাস করে খেতে হবে। কারণ অসুস্থ হলে ডাক্তার-ই আমাদের ভরসা।
একাধিক রোগীর স্বজনরা বলেন, যেকোনো ব্যাথা নিয়ে গেলেই ডাক্তার এক্স-রে, সিভিসিসহ রক্তের একাধিক টেষ্ট করতে দেন। তারা বলেন, মাজা, ঘাড়, হাত ও হাটুর ব্যথার জন্য এতোগুলো টেষ্ট কেনো? এসব টেষ্ট করতেই অনেক টাকা ফুরিয়ে যায়।
ঔষধ প্রশাসনের অনুমোদন ও প্রেসক্রিপশনে লেখার বিষয়ে জানতে চাইলে মাহফুজ বলেন, ‘এরকম আরও আছে। এগুলো বাজারে হাজার হাজার চলে। শাহানুর নামের এক ভাইয়ের কাছ থেকে নিয়ে আমরা চালাই।’ আর ক্যাপসুল ডি ক্যাপ ঈধঢ়. তবপধঢ় সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘এটি হারবাল প্রোডাক্ট। আমি প্রেসক্রিপশন করি। ডাক্তারের প্রেসক্রিপশনে কীভাবে ঔষধ লিখছেন এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘প্রেসক্রিপশনে লেখা যাবে না-এটা আপনাকে কে বলেছে? শুধু কি ডাক্তাররাই লিখতে পারবে?’ প্রশ্নের সুরে বলেন তিনি।
মাহফুজের সাথে কথা বলার পর শাহানুর নামের এক ব্যক্তি নিজেকে ‘গুডলাইট কোম্পানির লোক’ পরিচয় দিয়ে এই প্রতিবেদককে ফোন করেন। তিনি হুমকিস্বরুপ বলেন, ‘আপনি মাহফুজকে ফোন দিয়েছেন কেন? মাহফুজ কোম্পানির লোক, সে সাপ্লাই দিতেই পারে। ডাক্তার কী প্রোডাক্ট লিখলো, সেটা ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করবেন?’ আপনি কি আমাকে চার্জ করছেন এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘মাহফুজ ও আমি প্রতিবেশী ভাই। এ ছাড়া ঔষধ কোম্পানির নওগাঁ জেলা সমিতির সেক্রেটারি আমি, তাই আপনাকে ফোন করলাম।
ঔষধের বৈধতা সম্পর্কে জানতে চাইলে ডা. মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘এসব ঔষধ বৈধ নাকি অবৈধ, তা আমার দেখার বিষয় নয়। যদি অনুমোদন না থাকে, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর কী করছে? তাদের দায়িত্ব এসব দেখার।’ একপর্যায়ে গর্ব ও দাম্ভিকতা নিয়ে তিনি বলেন, ‘অবৈধ ঔষধও আমি লিখতে পারব।’ আর ‘প্রতিটা ওষুধেরই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকে।’ এইচএসসিস পাস করা মাহফুজ প্রেসক্রিপশন লিখতে পারেন কি না-এ প্রশ্নে তিনি বলেন, অবশ্যই প্রেসক্রিপশনে লিখতে পারবে। ‘মাহফুজ আমার ছোট ভাই। সে সহকারী হিসেবে আছে। আমি বলে দিই, সে লিখে।’
ঔষধ প্রশাসন নওগাঁ জেলা কার্যালয়ের তত্ত্বাবধায়ক রিতা রায়ের কাছে ঈযড়ষব ঈঋ-৩খ, সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এই ঔষধে আমাদের অনুমতি নেই।’ অনুমতি থাকলে অবশ্যই প্যাকেটের গায়ে অনুমোদন বা এনওসি নম্বর উল্লেখ থাকবে। আর কোনোভাবেই সাদা কাগজে এমআরপি মূল্য হাতে লেখা যাবে না। এদিকে ক্যাপসুল জিক্যাপ সম্পর্কেও ধারণা নেই নওগাঁ ঔষধ প্রশাসন অফিসের এক কর্মকর্তার।
জানতে চাইলে নওগাঁর সিভিল সার্জন ডা. আমিনুল ইসলাম মুঠোফোনে বলেন, ‘ঔষধ প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া কোনো ঔষধ লেখা যাবে না।’ ‘কেউ লিখে থাকলে ঔষধটি নির্দিষ্ট করে দেন, তাহলে আমরা তদন্ত করে দেখবো কেন লিখলো?’