তানিয়া আক্তার ফারজানা
পাঁচবারের গ্র্যামি জয়ী বেনিনের কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী অ্যাঞ্জেলিক কিডজো এবার যুক্ত হলেন হলিউডের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ তারকাদের তালিকায়। মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে এক জমকালো অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে হলিউড ওয়াক অব ফেমে তাঁর নামে তারকা উন্মোচন করা হয়। এর মধ্য দিয়ে তিনি হলিউড ওয়াক অব ফেমে তারকা পাওয়া প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকান শিল্পী হিসেবে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন।
৬৬ বছর বয়সী কিডজোর এই অর্জন শুধু তাঁর ব্যক্তিগত সাফল্য নয়; আফ্রিকার সংগীত ও সংস্কৃতির জন্যও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি আফ্রিকান ঐতিহ্য, আন্তর্জাতিক পপ, জ্যাজ ও বিভিন্ন সংগীতধারাকে একসঙ্গে মিশিয়ে নিজস্ব একটি সংগীতভাষা তৈরি করেছেন।
বেনিনে জন্ম নেওয়া অ্যাঞ্জেলিক কিডজো ছোটবেলা থেকেই সংগীতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি আফ্রিকা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক সংগীতাঙ্গনে নিজের অবস্থান তৈরি করেন। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তাঁর ১৮টি অ্যালবাম প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর সংগীতে আফ্রিকান সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের পাশাপাশি আধুনিক বিশ্বের বিভিন্ন সংগীতধারার প্রভাব রয়েছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শ্রোতাদের কাছে আফ্রিকান সংগীতকে আরও পরিচিত করে তুলতেও তাঁর ভূমিকা রয়েছে। এ কারণেই তাঁকে শুধু একজন গায়িকা হিসেবে নয়, আফ্রিকান সংস্কৃতির অন্যতম বৈশ্বিক দূত হিসেবেও দেখা হয়।
হলিউড ওয়াক অব ফেমে নিজের তারকা উন্মোচনের অনুষ্ঠানে কিডজো আফ্রিকার অবদানের কথা তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে আফ্রিকার সংগীত, সংস্কৃতি ও মানুষের দীর্ঘ ঐতিহ্যের কথা। বক্তব্য শেষে তিনি গান পরিবেশন করে উপস্থিত দর্শকদের মুগ্ধ করেন।
কিডজোর আন্তর্জাতিক সাফল্যের সবচেয়ে বড় প্রমাণগুলোর একটি হলো তাঁর পাঁচটি গ্র্যামি পুরস্কার। সংগীতের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত গ্র্যামিতে তাঁর এই সাফল্য তাঁকে বিশ্বসংগীতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পীতে পরিণত করেছে। তাঁর কাজ শুধু সংগীতশিল্পীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগীতশিল্পীর সঙ্গে কাজ করে তিনি আফ্রিকান সংগীতকে বিশ্বসংগীতের মূলধারার সঙ্গে আরও শক্তভাবে যুক্ত করেছেন।
কিডজোর তারকা উন্মোচন অনুষ্ঠানে সংগীত ও চলচ্চিত্র জগতের পরিচিত ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। রেকর্ডিং একাডেমির প্রধান হার্ভে ম্যাসন জুনিয়র তাঁর প্রশংসা করে বলেন, কিডজো সংগীতের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে সংযোগ তৈরি করেছেন এবং তাঁর কাজ বিনোদনের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। হলিউড অভিনেতা উইলেম ড্যাফোও কিডজোর প্রশংসা করেন। তাঁর মতে, মঞ্চে কিডজোর শক্তি, নাচ এবং পরিবেশনা অসাধারণ। তবে তাঁর কাছে কিডজোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো সংগীতের পাশাপাশি মানবিক কর্মকাণ্ডে তাঁর দীর্ঘদিনের ভূমিকা।
অ্যাঞ্জেলিক কিডজোর কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো তাঁর মানবিক কর্মকাণ্ড। তিনি Batonga Foundation-এর মাধ্যমে আফ্রিকার মেয়েদের ও তরুণ নারীদের শিক্ষা ও ক্ষমতায়নের জন্য কাজ করছেন। এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো এমন মেয়েদের সুযোগ তৈরি করা, যারা নানা সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাধার কারণে শিক্ষার সুযোগ থেকে পিছিয়ে পড়ে। ফলে কিডজোর পরিচয় শুধু একজন বিশ্বখ্যাত গায়িকা হিসেবে নয় একজন নারী অধিকার ও শিক্ষার প্রবক্তা হিসেবেও তৈরি হয়েছে।
হলিউড ওয়াক অব ফেমে একটি তারকা পাওয়া অনেক শিল্পীর জন্য ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় সম্মান। কিডজোর ক্ষেত্রে এই স্বীকৃতির গুরুত্ব আরও বেশি, কারণ এটি তাঁর ৪০ বছরের বেশি সময়ের সংগীতযাত্রা, আন্তর্জাতিক সাফল্য এবং মানবিক কাজের সম্মিলিত স্বীকৃতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
টাইম ম্যাগাজিন তাঁকে বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ১০০ ব্যক্তির তালিকায় স্থান দিয়েছে। বিবিসিও তাঁকে আফ্রিকার অন্যতম আইকনিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
তাই হলিউডের ব্যস্ত সড়কে কিডজোর নামে যুক্ত হওয়া এই তারকা শুধু তাঁর নামকে স্মরণীয় করে রাখবে না; এটি বিশ্বসংগীতে আফ্রিকার ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং আফ্রিকান শিল্পীদের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিরও প্রতীক হয়ে থাকবে।