বুধবার, ১৯ আগস্ট ২০২৬
হোম অপরাধ অর্থনীতি আইন-আদালত আন্তর্জাতিক খেলাধুলা গণমাধ্যম জাতীয় বিজ্ঞান-প্রযুক্তি বিনোদন রাজনীতি শিক্ষা সারাবাংলা

রবার্তো ক্লিমেন্তে: ব্যাট হাতে কিংবদন্তি, মানবতায় অনন্য

তানিয়া আক্তার ফারজানা
মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট ২০২৬, ১২:৫৭ pm
রবার্তো ক্লিমেন্তে: ব্যাট হাতে কিংবদন্তি, মানবতায় অনন্য

তানিয়া আক্তার ফারজানা

পুয়ের্তো রিকোর কিংবদন্তি বেসবল খেলোয়াড় রবার্তো ক্লিমেন্তে শুধু মাঠের অসাধারণ পারফরম্যান্সের জন্যই নয়, মানবিক কর্মকাণ্ড ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে অবস্থানের জন্যও আজও স্মরণীয়। ১৯৩৪ সালের ১৮ আগস্ট পুয়ের্তো রিকোর ক্যারোলিনায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। বেসবলের ইতিহাসে লাতিন আমেরিকার অন্যতম প্রথম বড় তারকা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন ক্লিমেন্তে। মাত্র ৩৮ বছর বয়সে তাঁর জীবন থেমে গেলেও খেলাধুলা ও মানবতার জগতে তাঁর প্রভাব আজও অমলিন।

ক্লিমেন্তের পেশাদার বেসবল ক্যারিয়ার শুরু হয় ১৯৫৫ সালে। এর আগে ১৯৫৪ সালে ব্রুকলিন ডজার্স তাঁকে পেশাদার চুক্তিতে সই করেছিল। তবে নিয়মের কারণে তাঁকে পরে পিটসবার্গ পাইরেটস দলে নেওয়ার সুযোগ পায়। ১৯৫৫ সালের ১ এপ্রিল মেজর লিগ বেসবলে অভিষেক হয় তাঁর। এরপর পুরো ক্যারিয়ারই কাটান পিটসবার্গ পাইরেটসের হয়ে।

১৮ বছরের মেজর লিগ ক্যারিয়ারে ক্লিমেন্তে খেলেছেন ২ হাজার ৪৩৩ ম্যাচ। ব্যাট হাতে তাঁর সংগ্রহ ৩ হাজার হিট, যা সেই সময়ের বেসবলে অত্যন্ত বিরল অর্জন ছিল। ক্যারিয়ারে তাঁর ব্যাটিং গড় ছিল .৩১৭, হোম রান ২৪০টি এবং রান ব্যাটেড ইন বা আরবিআই ছিল ১ হাজার ৩০৫। ১৯৭২ সালে ক্যারিয়ারের শেষ ব্যাটিংয়ে ৩ হাজারতম হিট পূর্ণ করেন তিনি। তখন তাঁর আগে মাত্র ১০ জন খেলোয়াড় এই মাইলফলকে পৌঁছেছিলেন।

ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি ফিল্ডিংয়েও অসাধারণ ছিলেন ক্লিমেন্তে। বিশেষ করে তাঁর শক্তিশালী থ্রো ছিল অন্যতম বড় অস্ত্র। অসাধারণ ফিল্ডিং দক্ষতার স্বীকৃতি হিসেবে তিনি ১২টি গোল্ড গ্লাভ অ্যাওয়ার্ড জিতেছেন। পাশাপাশি ১৫ বার অল-স্টার নির্বাচিত হন। জাতীয় লিগের ব্যাটিং শিরোপা জিতেছেন চারবার।

১৯৬৬ সালে ক্লিমেন্তে ন্যাশনাল লিগের সবচেয়ে মূল্যবান খেলোয়াড় বা এমভিপি নির্বাচিত হন। পিটসবার্গ পাইরেটসের হয়ে ১৯৬০ ও ১৯৭১ সালে দুটি ওয়ার্ল্ড সিরিজ শিরোপা জেতেন তিনি। ১৯৭১ সালের ওয়ার্ল্ড সিরিজে তাঁর অসাধারণ পারফরম্যান্স তাঁকে সিরিজের এমভিপি পুরস্কার এনে দেয়।

মাঠের সাফল্যের পাশাপাশি ক্লিমেন্তে লাতিন আমেরিকান খেলোয়াড়দের মর্যাদা ও সমান অধিকারের পক্ষেও সোচ্চার ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রে খেলাকালীন তাঁকে বর্ণবাদ ও বিদেশি পরিচয়ের কারণে বৈষম্যের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। মার্কিন গণমাধ্যমের একটি অংশ তাঁর স্প্যানিশ উচ্চারণ নিয়ে বিদ্রূপ করত এবং তাঁকে ‘বব’ বা ‘ববি’ নামে ডাকত। কিন্তু ক্লিমেন্তে নিজের নাম ‘রবার্তো’ হিসেবেই ব্যবহারের বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছিলেন।

লাতিন খেলোয়াড়দের অধিকার নিয়ে তাঁর অবস্থান তাঁকে শুধু একজন ক্রীড়াবিদ নয়, একজন সামাজিক ব্যক্তিত্বেও পরিণত করে। লাতিন আমেরিকানদের সম্পর্কে প্রচলিত নেতিবাচক ধারণা দূর করার বিষয়টিকে তিনি নিজের অন্যতম বড় সন্তুষ্টি হিসেবে দেখতেন। এ কারণে পরবর্তীকালে অনেকেই লাতিন খেলোয়াড়দের জন্য তাঁর ভূমিকার সঙ্গে জ্যাকি রবিনসনের বেসবলে কৃষ্ণাঙ্গ খেলোয়াড়দের পথ তৈরি করার ভূমিকার তুলনা করেছেন।

নিজের দেশ পুয়ের্তো রিকোর সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন ক্লিমেন্তে। মৌসুমের বাইরে দেশে ফিরে তিনি শীতকালীন লিগে খেলতেন, তরুণ খেলোয়াড়দের বেসবল প্রশিক্ষণ দিতেন এবং পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতেন। একই সঙ্গে বিভিন্ন মানবিক কর্মকাণ্ডেও যুক্ত ছিলেন।

জীবনের শেষ অধ্যায়েও তাঁর মানবিকতার পরিচয় পাওয়া যায়। ১৯৭২ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে নিকারাগুয়ায় ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য ত্রাণ সংগ্রহ ও সহায়তার উদ্যোগ নেন তিনি। ত্রাণসামগ্রী নিয়ে নিকারাগুয়ায় যাওয়ার জন্য একটি বিমানে যাত্রা করেন ক্লিমেন্তে। ৩১ ডিসেম্বর পুয়ের্তো রিকোর সান হুয়ান বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়নের কিছুক্ষণ পর বিমানটি বিধ্বস্ত হয়। এতে ক্লিমেন্তে ও বিমানের চার ক্রু সদস্য নিহত হন। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ৩৮ বছর।

ক্লিমেন্তের মৃত্যুর পর তাঁর অবদানকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়। সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী মৃত্যুর পর বেসবল হল অব ফেমে অন্তর্ভুক্তির জন্য পাঁচ বছর অপেক্ষা করতে হতো। কিন্তু তাঁর ক্ষেত্রে সেই নিয়ম শিথিল করা হয়। ১৯৭৩ সালের জুলাইয়ে তিনি ন্যাশনাল বেসবল হল অব ফেমে অন্তর্ভুক্ত হন। লাতিন আমেরিকায় জন্ম নেওয়া প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে এই সম্মান অর্জন করেন তিনি।

একই বছর মেজর লিগ বেসবলের খেলোয়াড়দের অসাধারণ ক্রীড়াসুলভ আচরণ ও সমাজসেবার স্বীকৃতি হিসেবে দেওয়া পুরস্কারের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘রবার্তো ক্লিমেন্তে অ্যাওয়ার্ড’। ফলে মাঠের সাফল্যের পাশাপাশি মানবিক কাজের জন্যও তাঁর নাম বেসবলের ইতিহাসে স্থায়ীভাবে যুক্ত হয়ে যায়। ৩ হাজার হিট, চারটি ব্যাটিং শিরোপা, ১২টি গোল্ড গ্লাভ, ১৫টি অল-স্টার নির্বাচন, একটি ন্যাশনাল লিগ এমভিপি এবং দুটি ওয়ার্ল্ড সিরিজ শিরোপা ক্লিমেন্তের পরিসংখ্যানই তাঁর অসাধারণ ক্যারিয়ারের সাক্ষ্য দেয়। তবে তাঁর উত্তরাধিকার শুধু এসব সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়। খেলোয়াড় হিসেবে সাফল্য, বৈষম্যের বিরুদ্ধে অবস্থান এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা সব মিলিয়ে রবার্তো ক্লিমেন্তে বেসবলের ইতিহাসে এক অনন্য কিংবদন্তি হয়ে আছেন।

Viewer Image
×
লিংক কপি করা হয়েছে!