তানিয়া আক্তার ফারজানা, টঙ্গী, (গাজীপুর) প্রতিনিধি-
বাংলাদেশের চা-বাগানগুলোতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বসবাস করে আসছেন বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ। কিন্তু ‘চা-শ্রমিক’ পরিচয়ের আড়ালে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে তাদের স্বতন্ত্র ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতিগত পরিচয়। দীর্ঘদিনের দারিদ্র্য, শ্রমনির্ভর জীবন এবং নানা ধরনের বঞ্চনার কারণে নিজেদের ঐতিহ্য ধরে রাখার সুযোগও কমে যাচ্ছে তাদের। দেশজুড়ে গত ৩২ বছর ধরে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস পালিত হলেও চা-বাগানের অনেক শ্রমিক এখনো এই দিবসের গুরুত্ব সম্পর্কে জানেন না। দারিদ্র্য ও প্রতিদিনের শ্রমের চাপে নিজেদের জাতিগত পরিচয়, অধিকার ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নিয়ে ভাবার সুযোগও তাদের খুব কম।
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল ও হবিগঞ্জের চানপুরের কয়েকটি চা-বাগান ঘুরে দেখা গেছে, প্রচণ্ড রোদ কিংবা ভারী বৃষ্টির মধ্যেও শ্রমিকরা চা-পাতা সংগ্রহ করে যাচ্ছেন। তাদের অনেকেই জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস সম্পর্কে তারা আগে কখনো শোনেননি। হবিগঞ্জের চানপুর চা-বাগানের শ্রমিক গৌরা লোহার বলেন, দারিদ্র্য ও কঠিন জীবনযাপনের মধ্যে তারা নিজেদের জাতিগত পরিচয়ই অনেকটা ভুলে গেছেন। তাদের কাছে বিশেষ কোনো দিবসের চেয়ে প্রতিদিনের জীবন-সংগ্রামই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
শ্রীমঙ্গলের হারিণছড়া চা-বাগানে ১৪ বছর বয়স থেকে কাজ করছেন ৪৭ বছর বয়সী কাসাইল্লা ঘাটুয়াল। কাজ শুরুর সময় তার দৈনিক মজুরি ছিল মাত্র ২০ টাকা। বর্তমানে তা বেড়ে ১৮৭ টাকা হলেও এই আয় দিয়ে পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণ করা কঠিন। তিনি বলেন, এই আয় দিয়ে পরিবারের সবাইকে দিনে দুই বেলা ভালোভাবে খাওয়ানো সম্ভব হয় না। নিজের একটি বাড়ি করার স্বপ্ন থাকলেও এত কম আয়ে সেই স্বপ্ন পূরণ করা তার কাছে প্রায় অসম্ভব।
বাংলাদেশ চা-শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক নিপেন পাল বলেন, চা-শিল্পের সঙ্গে চা-শ্রমিকদের পরিবারের বহু প্রজন্ম যুক্ত থাকলেও তাদের জীবনযাত্রার তেমন উন্নতি হয়নি। চা-শিল্প এগিয়েছে, কিন্তু শ্রমিকদের জীবনে সেই অগ্রগতির প্রভাব খুব সামান্যই পড়েছে। পাত্রকালা চা-বাগানের লিটন গঞ্জু বলেন, চা-বাগানগুলোতে অনেক কম পরিচিত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ বসবাস করেন। তাদের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। মণিপুরি, খাসিয়া বা গারো সম্প্রদায়ের মতো কিছু জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি সংরক্ষণে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থাকলেও চা-বাগানে বসবাসকারী প্রায় ৩০ থেকে ৩৫টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য একই ধরনের সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান নেই। সিলেট টি কমিউনিটি স্টুডেন্টস ইয়ুথ ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের সভাপতি দিলীপ রঞ্জন কুর্মি বলেন, ‘চা-শ্রমিক’ মূলত একটি পেশাগত পরিচয়, জাতিগত পরিচয় নয়। তার হিসাবে বাংলাদেশের চা-বাগানগুলোতে প্রায় ১০ লাখ মানুষ বসবাস করেন।
তিনি চা-শ্রমিকদের জীবনকে চা-গাছের সঙ্গে তুলনা করে বলেন, যেভাবে চা-গাছকে নির্দিষ্ট উচ্চতার বেশি বাড়তে দেওয়া হয় না, তেমনি চা-শ্রমিকদের জীবনও নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে আটকে আছে। চা-বাগানের সবুজ সৌন্দর্য দেখা গেলেও সেই সবুজের আড়ালে শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের কষ্ট ও অশ্রু অনেক সময় চোখে পড়ে না।
ভাষা অধিকারকর্মী এবং ল্যাঙ্গুয়েজ রিসোর্স হাবের প্রধান সমর এম সরেন বলেন, চা-বাগানের জনগোষ্ঠীর সংকট শুধু দারিদ্র্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে তাদের ভাষা, সংস্কৃতি, জাতিগত পরিচয় এবং মানবাধিকারের বিষয়ও জড়িত। তার মতে, মাতৃভাষায় শিক্ষার সুযোগ না থাকায় নতুন প্রজন্মের মধ্যে সাঁওতালি, কুরুখ ও মুন্ডারির মতো ভাষা দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। এর পরিবর্তে তারা চা-বাগান এলাকায় প্রচলিত ‘বাগানি ভাষা’ বা সাদরির ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। এর ফলে শুধু ভাষাই হারাচ্ছে না, হারিয়ে যাচ্ছে লোকগান, মৌখিক ঐতিহ্য, প্রচলিত চিকিৎসাপদ্ধতি এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সঞ্চিত নানা ধরনের জ্ঞানও। সমর এম সরেন বলেন, একটি ভাষা হারিয়ে যাওয়া মানে শুধু কিছু শব্দ হারিয়ে যাওয়া নয়; এর সঙ্গে হারিয়ে যায় একটি জনগোষ্ঠীর পৃথিবীকে দেখার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি, ইতিহাস ও জ্ঞানব্যবস্থাও।
বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সিলেট বিভাগীয় সভাপতি গৌরাঙ্গ পাত্র চা-বাগানে বসবাসকারী সব ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীকে রাষ্ট্রের সরকারি আদিবাসী তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি তাদের সাংবিধানিক অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো এবং ভাষা ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
চা-বাগানের শ্রমিকদের জীবন তাই শুধু চা-পাতা সংগ্রহ আর মজুরির হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাদের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু প্রজন্মের ইতিহাস, ভাষা, সংস্কৃতি ও স্বতন্ত্র পরিচয়। দারিদ্র্য ও দীর্ঘদিনের অবহেলার কারণে সেই ঐতিহ্য আজ হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে। তাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি ভাষা, সংস্কৃতি ও অধিকার সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়া হলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের চা-বাগানের বহু স্বতন্ত্র জনগোষ্ঠীর নিজস্ব পরিচয়ের একটি বড় অংশ হারিয়ে যেতে পারে।