রবিবার, ০৯ আগস্ট ২০২৬
হোম অপরাধ অর্থনীতি আইন-আদালত আন্তর্জাতিক খেলাধুলা গণমাধ্যম জাতীয় বিজ্ঞান-প্রযুক্তি বিনোদন রাজনীতি শিক্ষা সারাবাংলা

নাটকের জন্য এখনো একটি স্থায়ী প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারিনি: রামেন্দু মজুমদার

তানিয়া আক্তার ফারজানা
রবিবার, ০৯ আগস্ট ২০২৬, ১১:২১ am
নাটকের জন্য এখনো একটি স্থায়ী প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারিনি: রামেন্দু মজুমদার

তানিয়া আক্তার ফারজানা

একুশে পদকপ্রাপ্ত বরেণ্য নাট্যব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার আজ ৮৬ বছরে পা দিয়েছেন। বাংলাদেশের মঞ্চনাটকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই ব্যক্তিত্ব দীর্ঘ পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে নাট্যচর্চা, সাংগঠনিক কাজ ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত। তিনি প্রখ্যাত নাট্যদল থিয়েটারের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক এবং পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে ‘থিয়েটার’ পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করছেন। আন্তর্জাতিক থিয়েটার ইনস্টিটিউটের (আইটিআই) সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন তিনি। ৮৬ বছর বয়সেও মঞ্চে সক্রিয় রয়েছেন রামেন্দু মজুমদার। বর্তমানে ‘লাভ লেটার্স’ ও ‘মেরাজ ফকিরের মা’ নাটকে অভিনয় করছেন তিনি। স্ত্রী প্রখ্যাত অভিনেত্রী ফেরদৌসী মজুমদার এবং একমাত্র মেয়ে অভিনেত্রী ও নির্দেশক ত্রপা মজুমদারও নাট্যজগতের সঙ্গে যুক্ত।

জীবনের দীর্ঘ পথ ফিরে দেখে রামেন্দু মজুমদার বলেন, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জীবনের সৌন্দর্য আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করা যায়। অনেক সময় মনে হয়, জীবনকে আরও বেশি উপভোগ করা উচিত ছিল। তবে জীবন নিয়ে তার কোনো আক্ষেপ নেই। নিজের জীবনকে তিনি কখনো গরুর গাড়িতে, কখনো বিমানে ভ্রমণের সঙ্গে তুলনা করেছেন। এক জীবনে অনেকটা পথ পাড়ি দিতে পেরেছেন বলেই নিজেকে ভাগ্যবান মনে করেন তিনি। তবে জীবনের ক্ষেত্রে কোনো আক্ষেপ না থাকলেও নিজের শিল্পীজীবন নিয়ে কিছু অপূর্ণতা রয়েছে বলে জানান তিনি। তার সবচেয়ে বড় আক্ষেপগুলোর একটি হলো, এখনো তিনি এমন কোনো অসাধারণ নাটক তৈরি করতে পারেননি, যা তার প্রত্যাশা পূরণ করবে। পাশাপাশি ‘থিয়েটার স্কুল’-এর জন্য একটি স্থায়ী জায়গা ও মহড়া করার স্থায়ী স্থান প্রতিষ্ঠার চেষ্টাও এখনো সফল হয়নি।

রামেন্দু মজুমদার বলেন, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের দিকে তাকালে দেখা যায়, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ একটি স্থায়ী প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। কিন্তু তারা এখনো তা করতে পারেননি। তবে একজন শিল্পীর অপূর্ণতার অনুভূতি কখনো পুরোপুরি শেষ হয় না বলেও মনে করেন তিনি। শৈশব থেকেই শিল্প ও নাটকের পরিবেশে বেড়ে উঠেছেন রামেন্দু মজুমদার। তার বাবা, বড় ভাই ও ছোট বোন তিনজনই অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ফলে শিল্পচর্চায় যুক্ত হওয়া তার কাছে স্বাভাবিকভাবেই এসেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি নাটকের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। ধীরে ধীরে উপলব্ধি করেন, নাটকই একজন শিল্পী হিসেবে তার ভাবনা ও বক্তব্য প্রকাশের সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম। সেখান থেকেই মঞ্চনাটক ও শিল্পকে জীবনের পথ হিসেবে বেছে নেন।

গত পাঁচ দশকে থিয়েটারের সবচেয়ে বড় অর্জন কী এ প্রশ্নের উত্তরে রামেন্দু মজুমদার বলেন, বাস্তব জীবন ও সমকালীন সমাজের সঙ্গে সম্পর্কিত নাটক মঞ্চস্থ করার চেষ্টা তারা সবসময় করেছেন। মুক্তিযুদ্ধ, তরুণ সমাজ এবং নারীর ক্ষমতায়নের মতো বিষয় তাদের নাটকে বারবার উঠে এসেছে। নাট্যকার আবদুল্লাহ আল মামুনকে থিয়েটারের জন্য বড় শক্তি হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। তার মতে, দলের চিন্তা ও লক্ষ্য তিনি খুব ভালোভাবে বুঝতেন। থিয়েটার শুধু বিনোদন দেওয়ার মাধ্যম নয়, বরং মানুষের সামনে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা তুলে ধরারও মাধ্যম এ বিশ্বাস থেকেই তারা নাটক মঞ্চস্থ করেছেন। আবদুল্লাহ আল মামুনের মৃত্যুর পর সমকালীন বিষয় নিয়ে নাটক তৈরি করা আরও কঠিন হয়ে উঠেছে বলেও জানান তিনি। তবে সেই চেষ্টা এখনো অব্যাহত রয়েছে।

নাটকের দর্শক বাড়ানো এবং মঞ্চনাটককে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করাকেও নিজেদের বড় অর্জন বলে মনে করেন রামেন্দু মজুমদার। পাশাপাশি ৫৪ বছর ধরে ‘থিয়েটার’ পত্রিকা প্রকাশ এবং পুরো সময়জুড়ে নিজে সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করাকেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করেন।

বাংলাদেশের মঞ্চনাটকের সঙ্গে কলকাতার নাট্যচর্চার তুলনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দুই অঞ্চলের নাট্যধারাকে সরাসরি তুলনা করা কঠিন। কলকাতায় নাট্যচর্চার ঐতিহ্য দীর্ঘদিনের। পূর্ব বাংলাতেও নাটকের চর্চা ছিল, তবে দেশভাগের পর তা অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়ে। পাকিস্তান আমলেও নাট্যচর্চা খুব বেশি সহযোগিতা পায়নি। তার মতে, কলকাতায় নাট্যকারের সংখ্যা বেশি হলেও বাংলাদেশে দক্ষ অভিনেতার সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। কলকাতার অভিনেতাদের কণ্ঠের সূক্ষ্ম ব্যবহারে দক্ষতা বেশি দেখা যায়, অন্যদিকে বাংলাদেশের অভিনেতাদের মধ্যে স্বতঃস্ফূর্ততা বেশি। বাংলাদেশের নাটকে জীবন ও সমাজের নানা বিষয় বেশি গুরুত্ব পায় বলেও তিনি মনে করেন। একই ভাষা ও সংস্কৃতির কারণে দুই বাংলার মধ্যে সাংস্কৃতিক বিনিময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি। দুই দেশের নাট্যদল একে অপরের দেশে গিয়ে নাটক পরিবেশন করলে পারস্পরিক দূরত্ব ও বিভাজন কমে আসে বলেও মন্তব্য করেন এই নাট্যব্যক্তিত্ব।

সম্প্রতি প্রয়াত বরেণ্য নাট্যব্যক্তিত্ব আতাউর রহমানের কথাও স্মরণ করেন রামেন্দু মজুমদার। দীর্ঘদিনের সহকর্মী ও বন্ধু আতাউর রহমানের সঙ্গে তার বহু স্মৃতি রয়েছে। বিদেশ ভ্রমণের সময় তার সঙ্গে সময় কাটানো ছিল আনন্দের বলে জানান তিনি। আতাউর রহমানকে অসাধারণ নির্দেশক, রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য নিয়ে গভীরভাবে কাজ করা এবং একজন আগ্রহী পাঠক হিসেবে স্মরণ করেন তিনি। তার মতে, সবকিছুর ঊর্ধ্বে আতাউর রহমান ছিলেন একজন পরিপূর্ণ মানুষ। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক শিক্ষকের ভিডিও নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্ক নিয়েও কথা বলেন রামেন্দু মজুমদার। তার মতে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে অনেকেই যেন সীমাহীন একটি জায়গা হিসেবে ব্যবহার করছেন এবং সেখানে চরিত্রহননের প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। ওই শিক্ষকের ভিডিওতে তিনি আপত্তিকর কিছু দেখেননি বলেও জানান।

শিক্ষকদের সাম্প্রতিক সময়ে অপমান ও হয়রানির শিকার হওয়ার ঘটনাগুলো তাকে বেশি কষ্ট দেয় বলে জানান তিনি। নেত্রকোনার এক শিক্ষকের মোটরসাইকেলে আগুন দেওয়ার ঘটনাও উল্লেখ করেন তিনি। ওই শিক্ষক চাকরি পাওয়ার পর নতুন মোটরসাইকেল কেনার সামর্থ্য না থাকার কথা জানিয়েছিলেন। পরে তাদের সংগঠনের পক্ষ থেকে তাকে একটি মোটরসাইকেল দেওয়া হয়। একটি জাতির অগ্রগতিতে শিল্প ও সংস্কৃতির গুরুত্ব অপরিসীম বলে মনে করেন রামেন্দু মজুমদার। বিশেষ করে বাঙালি জাতির জন্য সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ছাড়া এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয় বলে তিনি মনে করেন। শিশুদের ছোটবেলা থেকেই পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত করে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। এ ক্ষেত্রে সরকারেরও উৎসাহ ও সহযোগিতা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

অন্যের সাফল্য তাকে সবচেয়ে বেশি আনন্দ দেয় বলেও জানান রামেন্দু মজুমদার। সংবাদপত্রে সাধারণ মানুষের সাফল্যের গল্প পড়তে তিনি ভালোবাসেন। দীর্ঘ ১২ থেকে ১৩ বছর বাংলাদেশ টেলিভিশনে একটি অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেছেন, যেখানে সমাজের উন্নয়নে নীরবে কাজ করে যাওয়া প্রায় ৪০০ মানুষের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। তাদের অনেকেই খ্যাতি চাননি; মানুষের জন্য ভালো কিছু করাই ছিল তাদের লক্ষ্য। এমনকি একজন রিকশাচালক নিজের উদ্যোগে একটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এমন মানুষের গল্প তাকে গভীরভাবে আনন্দ দেয়।

টেলিভিশনে তুলনামূলকভাবে কম কাজ করার কারণও জানান তিনি। বাংলাদেশ টেলিভিশনের শুরুর দিকের নাটকগুলোর একটি ‘একতলা দোতলা’-তে অভিনয় করেছিলেন। দীর্ঘদিন সংবাদ পাঠও করেছেন। সে সময় সংবাদ পাঠকদের অভিনয়ে উৎসাহিত করা হতো না। পাশাপাশি সাংগঠনিক কাজেও তিনি বেশি ব্যস্ত ছিলেন। বর্তমানে অবশ্য ‘মেরাজ ফকিরের মা’ ও ‘লাভ লেটার্স’ নাটকে নিয়মিত অভিনয় করছেন। ‘লাভ লেটার্স’ নাটকটি নির্দেশনা দিচ্ছেন তার মেয়ে ত্রপা মজুমদার। নিজের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে স্ত্রী ফেরদৌসী মজুমদারের অবদানকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন রামেন্দু মজুমদার। তার ভাষায়, ফেরদৌসী মজুমদার সংসার ও মেয়ের বেড়ে ওঠার দায়িত্ব সামলেছেন বলেই তিনি নিজের কাজ ও শিল্পচর্চায় এতটা সময় দিতে পেরেছেন।

দীর্ঘ শিল্পীজীবন, মঞ্চনাটকের প্রতি অবিচল নিষ্ঠা এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনে পাঁচ দশকের বেশি সময়ের অবদানের মধ্য দিয়ে রামেন্দু মজুমদার বাংলাদেশের নাট্যজগতের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে পরিণত হয়েছেন। ৮৬ বছর বয়সেও মঞ্চে সক্রিয় থেকে তিনি সেই পথচলা অব্যাহত রেখেছেন।

Viewer Image
×
লিংক কপি করা হয়েছে!