রবিবার, ০৯ আগস্ট ২০২৬
হোম অপরাধ অর্থনীতি আইন-আদালত আন্তর্জাতিক খেলাধুলা গণমাধ্যম জাতীয় বিজ্ঞান-প্রযুক্তি বিনোদন রাজনীতি শিক্ষা সারাবাংলা

শিশুদের বই পড়ার প্রতি ভালোবাসা তৈরি করবেন যেভাবে

তানিয়া আক্তার ফারজানা
শনিবার, ০৮ আগস্ট ২০২৬, ০৬:২৯ pm
শিশুদের বই পড়ার প্রতি ভালোবাসা তৈরি করবেন যেভাবে

টঙ্গী, গাজীপুর প্রতিনিধি-

তানিয়া আক্তার ফারজানা

ডিজিটাল ডিভাইস, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও দ্রুতগতির তথ্যপ্রবাহের যুগে শিশুদের মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস কমে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে অভিভাবক, শিক্ষক ও শিক্ষাবিদদের উদ্বেগ বাড়ছে। তবে শিশুদের কেন বই পড়তে আগ্রহী করা যাচ্ছে না শুধু সেই প্রশ্ন না করে, তাদের চারপাশের বড়রা কী ধরনের অভ্যাস তৈরি করছেন, সেদিকেও নজর দেওয়া জরুরি। ছয় বছরের কম বয়সী ২৪ শিশুর অভিভাবককে নিয়ে করা একটি জরিপে জানতে চাওয়া হয়েছিল, তাঁরা কত ঘন ঘন সন্তানদের বই পড়ে শোনান। দেখা যায়, মাত্র ২ শতাংশ অভিভাবক সপ্তাহে অন্তত একবার সন্তানদের পড়ে শোনান। এই চিত্র থেকে বোঝা যায়, শিশুদের পড়ার অভ্যাস কমে যাওয়ার পেছনে শুধু প্রযুক্তি বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দায়ী নয়; পরিবার ও বড়দের অভ্যাসও এর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।

একসময় পরিবার ও সমাজে গল্প বলার একটি শক্তিশালী সংস্কৃতি ছিল। দাদা-দাদি, নানা-নানি, বড় ভাই-বোন কিংবা প্রতিবেশীদের কাছ থেকে শিশুরা নানা ধরনের গল্প শুনত। রূপকথা, লোককথা, ভৌতিক গল্প কিংবা জীবনের নানা অভিজ্ঞতার গল্প শিশুদের কল্পনাশক্তি ও চিন্তাভাবনাকে সমৃদ্ধ করত। গল্প শুধু বিনোদন দেয় না; এটি শিশুদের মানসিকতা, নৈতিক বোধ, আত্মবিশ্বাস এবং মানুষের চিন্তা ও জীবন সম্পর্কে ধারণা গড়ে তুলতে সাহায্য করে। জীবনের জটিলতা, চ্যালেঞ্জ, সম্ভাবনা ও সুযোগ সম্পর্কে শিশুদের ভাবতে শেখায় গল্প। একইভাবে বই পড়ার মাধ্যমে শিশু কৌতূহলী হতে শেখে, নিজের মতো করে চিন্তা করার সুযোগ পায় এবং নতুন জ্ঞান অর্জন করে।

স্কুলে পাঠচক্র বা লাইব্রেরির সময় থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে শিশুরা কী পড়েছে, সে বিষয়ে নিজের মতামত প্রকাশের যথেষ্ট সুযোগ পায় না। অথচ পড়াকে সত্যিকার অর্থে ফলপ্রসূ করতে হলে এটি একমুখী প্রক্রিয়া হওয়া উচিত নয়। শিশুরা যে গল্প বা বই পড়েছে, সেটি নিজের ভাষায় বলতে পারলে, বিশ্লেষণ করতে পারলে কিংবা কোনো বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করতে পারলে তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ে। একই সঙ্গে নিজের চিন্তা গুছিয়ে প্রকাশ করা এবং অন্যের সঙ্গে যোগাযোগের দক্ষতাও তৈরি হয়। তাই বাবা-মা ও শিক্ষকদের উচিত শুধু ‘বই পড়েছ?’ জিজ্ঞেস না করে, গল্পটি কেমন লেগেছে, কোন চরিত্রটি ভালো লেগেছে কিংবা শিশুটি ওই পরিস্থিতিতে থাকলে কী করত এ ধরনের প্রশ্ন করা। এতে বই পড়া শিশুর কাছে আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে। বই পড়ার পর শিশুর কথা মনোযোগ দিয়ে শোনাও গুরুত্বপূর্ণ। সে কী বুঝেছে, কোন বিষয়টি ভালো লেগেছে কিংবা কোন জায়গাটি নিয়ে তার প্রশ্ন রয়েছে এসব নিয়ে বড়দের সঙ্গে আলোচনা করলে বই পড়া তার কাছে আরও আনন্দদায়ক অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়।

শিশুরা তাদের চারপাশের মানুষকে অনুসরণ করে। তাই শিশু বই পড়ুক এমন প্রত্যাশা করার আগে বাবা-মা, শিক্ষক ও অভিভাবকদের নিজেদের অভ্যাসের দিকেও তাকাতে হবে। বাড়িতে যদি শিশুরা নিয়মিত বড়দের বই পড়তে দেখে, বই নিয়ে আলোচনা শুনতে পায় এবং পড়ার জন্য উৎসাহ পায়, তাহলে তাদের মধ্যেও পড়ার আগ্রহ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। অর্থাৎ শিশুদের বই পড়ায় আগ্রহী করার অন্যতম কার্যকর উপায় হলো তাদের পড়ার সংস্কৃতির মধ্যে বেড়ে ওঠার সুযোগ দেওয়া। শিশুর হাতে বই তুলে দিলেই সে পড়তে শুরু করবে এমনটা সবসময় হয় না। কোন বই পড়বে, সে বিষয়ে শিশুকে কিছুটা স্বাধীনতা দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর পছন্দের বাইরে জোর করে নির্দিষ্ট বই পড়তে দিলে অনেক সময় তার মধ্যে বইয়ের প্রতি অনীহা তৈরি হতে পারে। বরং গল্প, কবিতা, রোমাঞ্চ, বিজ্ঞান, প্রাণী, প্রকৃতি কিংবা কল্পকাহিনি বিভিন্ন ধরনের বই থেকে নিজের পছন্দ অনুযায়ী বেছে নেওয়ার সুযোগ দিলে শিশুর পড়ার আগ্রহ বাড়তে পারে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল কনটেন্টের কারণে শিশুদের মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা কমছে এমন আলোচনা এখন প্রায়ই শোনা যায়। তবে শুধু মোবাইল বা অন্যান্য ডিভাইস ব্যবহারের সময় কমিয়ে দিলেই শিশুরা স্বাভাবিকভাবে বই পড়তে শুরু করবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। এর পাশাপাশি শিশুদের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলা, তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং বই নিয়ে দ্বিমুখী আলোচনা করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। আজকের ‘স্ক্রল, সোয়াইপ ও দ্রুত তথ্য’-নির্ভর সময়ে বই শিশুদের ধীর হতে, মনোযোগ দিতে এবং কোনো বিষয় গভীরভাবে চিন্তা করতে শেখায়। বই পড়ার মাধ্যমে শিশুদের জ্ঞান, সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি, সহমর্মিতা, যোগাযোগ দক্ষতা ও কৌতূহল বাড়ে। দীর্ঘমেয়াদে একটি সমাজে পড়ার সংস্কৃতি শিক্ষিত, সহনশীল, চিন্তাশীল ও সৃজনশীল নাগরিক তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তাই শিশু কেন বই পড়ছে না এই প্রশ্নের পাশাপাশি আমাদের ভাবতে হবে, শিশুরা আমাদের কাছ থেকে কী শিখছে এবং কাদের অনুসরণ করছে। তাদের বইয়ের প্রতি ভালোবাসা তৈরি করতে প্রয়োজন জোর নয়; প্রয়োজন বই পড়ার পরিবেশ, পছন্দের স্বাধীনতা, গল্প শোনার সুযোগ এবং তাদের চিন্তাকে গুরুত্ব দিয়ে শোনার মতো একজন মনোযোগী বড় মানুষ।

সবশেষে বলা যায়, পড়ার অভ্যাস শিশুদের কৌতূহলকে আরও গভীর করে। আর এই কৌতূহলই সব ধরনের শেখার অন্যতম ভিত্তি।

Viewer Image
×
লিংক কপি করা হয়েছে!