রবিবার, ০৯ আগস্ট ২০২৬
হোম অপরাধ অর্থনীতি আইন-আদালত আন্তর্জাতিক খেলাধুলা গণমাধ্যম জাতীয় বিজ্ঞান-প্রযুক্তি বিনোদন রাজনীতি শিক্ষা সারাবাংলা

নারীর জীবন, স্মৃতি ও হারিয়ে যাওয়া ঘরের গল্প: ‘চৌকাঠ’ প্রদর্শনী

তানিয়া আক্তার ফারজানা
শনিবার, ০৮ আগস্ট ২০২৬, ০৮:২১ am
নারীর জীবন, স্মৃতি ও হারিয়ে যাওয়া ঘরের গল্প: ‘চৌকাঠ’ প্রদর্শনী

টঙ্গী, গাজীপুর প্রতিনিধি-

তানিয়া আক্তার ফারজানা

নারী, ঘরোয়া পরিসর, স্মৃতি ও পরিচয়ের নানা আন্তঃসম্পর্ক তুলে ধরে শিল্পী সারা জাবিনের দ্বিতীয় একক শিল্পপ্রদর্শনী ‘চৌকাঠ’ দর্শকদের সামনে হাজির হয়েছে। বাঙালি পরিবারের প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও নারীর ভূমিকা এই প্রদর্শনীর মূল ভাবনায় উঠে এসেছে। গত ৩১ জুলাই ঢাকার আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য ঢাকা (AFD)-এর লা গ্যালারিতে প্রদর্শনীটির উদ্বোধন হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন শিল্পী ও লেখক মুস্তাফা জামান, বাংলাদেশে ফ্রান্স দূতাবাসের কালচারাল অ্যাটাশে বাপতিস্ত ল্যব্রে এবং আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য ঢাকার পরিচালক ফ্রাঁসোয়া শঁব্রো।

উদ্বোধনী বক্তব্যে বাপতিস্ত ল্যব্রে নারীর জীবন ও নারীত্ব নিয়ে সারা জাবিনের শিল্পচর্চার প্রশংসা করেন। অন্যদিকে মুস্তাফা জামান শিল্পীর ২০ শতকের মাঝামাঝি থেকে শেষভাগের স্থাপত্যশৈলীকে ক্ষুদ্রাকারে পুনর্নির্মাণের প্রশংসা করেন।

প্রদর্শনীর নাম ‘চৌকাঠ’ যার অর্থ দরজা বা প্রবেশসীমা। শিল্পীর ভাষ্যে এটি একই সঙ্গে ব্যক্তিগত ও জনপরিসর, অতীত ও বর্তমান এবং ব্যক্তিগত স্মৃতি ও সামষ্টিক ইতিহাসের মধ্যবর্তী সীমারেখার প্রতীক। সারা জাবিনের শিল্পকর্মে নারীর এমন একটি ভূমিকা তুলে ধরা হয়েছে, যা প্রায়ই চোখের আড়ালে থেকে যায়। পরিবার ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্মৃতি ধরে রাখার ক্ষেত্রে নারীর অবদানকে তিনি বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। প্রদর্শনীতে চারটি ভিন্ন ধারার কাজ রয়েছে, যেখানে ঘর, পরিবার, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও স্থাপত্যের সঙ্গে মানুষের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ফুটে উঠেছে।

প্রদর্শনীর উল্লেখযোগ্য কাজগুলোর একটি ‘দ্য ডিমিনিশড টাইম’ সিরিজ। এতে ১৯৫০ থেকে ১৯৯০-এর দশকের পুরান ঢাকার বাড়িগুলোর স্থাপত্য ঐতিহ্য তুলে ধরা হয়েছে। সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যাওয়া পারিবারিক ও ব্যক্তিগত পরিসরের স্মৃতি শিল্পী ফুটিয়ে তুলেছেন সাবান খোদাইয়ের সূক্ষ্ম ভাস্কর্যের মাধ্যমে। ফুলের নকশা, খিলান, সরু সিঁড়ি ও খোলা স্থানের ব্যবহারে এসব কাজে নব্য-ঔপনিবেশিক ও আর্ট নুভো স্থাপত্যের ছাপ দেখা যায়। স্বচ্ছ কাপড় ও পাতলা তামার তার দিয়ে তৈরি আধা-বিমূর্ত রেখাচিত্রে বাঙালি সমাজের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় উৎসবও উঠে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে গায়ে হলুদ, পিঠা উৎসব, শবে বরাত এবং মেয়েদের কান বা নাক ফোঁড়ানোর মতো পারিবারিক আয়োজন।

সারা জাবিন বলেন, এসব আয়োজন এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি বাণিজ্যিক ও বড় পরিসরে হলেও এর মধ্যে থেকে ধীরে ধীরে ঘনিষ্ঠতা, পারস্পরিক সম্প্রীতি ও পাড়া-প্রতিবেশীর সেই পুরোনো বন্ধন হারিয়ে যাচ্ছে। ‘বন ভয়েড’ সিরিজে লিনোকাট প্রিন্টের মাধ্যমে নারীর পরিচয় ও সামাজিক- পারিবারিক প্রত্যাশার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। এখানে শিল্পী নিজের মায়ের জীবন ও অপূর্ণ স্বপ্নের কথাও ভেবেছেন। মেয়েবেলা, স্ত্রী ও মা হিসেবে মায়ের জীবনের বিভিন্ন সময়ের ছবি দেখে সেই স্মৃতিগুলোকে হাতে তৈরি প্রিন্টের মাধ্যমে পুনর্নির্মাণ করেছেন তিনি।

অন্যদিকে ‘শারশি’ সিরিজে শিল্পী ঘরের অভ্যন্তরীণ পরিসর এবং সেখানে নারীর দীর্ঘদিনের অদৃশ্য উপস্থিতিকে সামনে এনেছেন। সূচিকর্ম করা মসলিনে আদর্শ পরিবার ও ঘরের একটি চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এর নিচে থাকা অপেক্ষাকৃত সাধারণ টাঙ্গাইল কাপড় প্রতীকীভাবে সেই নারীদের ত্যাগকে নির্দেশ করে, যাদের অবদান পুরো পারিবারিক কাঠামোকে ধরে রাখে। সব মিলিয়ে ‘চৌকাঠ’ প্রদর্শনীতে নারীর জীবন ও সমাজে তাঁদের ভূমিকার পাশাপাশি দৈনন্দিন জীবন থেকে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাওয়া মানবিক সম্পর্ক, পারিবারিক ঘনিষ্ঠতা ও সাংস্কৃতিক স্মৃতিকেও তুলে ধরা হয়েছে।

‘চৌকাঠ’ প্রদর্শনীটি ৮ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত ঢাকার আলিয়ঁস ফ্রঁসেজে দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।

Viewer Image
×
লিংক কপি করা হয়েছে!