শনিবার, ০৮ আগস্ট ২০২৬
হোম অপরাধ অর্থনীতি আইন-আদালত আন্তর্জাতিক খেলাধুলা গণমাধ্যম জাতীয় বিজ্ঞান-প্রযুক্তি বিনোদন রাজনীতি শিক্ষা সারাবাংলা

৫৫ বছরেও দেশে ফেরেনি শহিদ বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক আব্দুল ওয়াহাব তালুকদারের সমাধি

মোঃ আসাদুজ্জামান খোকন ভূরুঙ্গামারী প্রতিনিধি
শুক্রবার, ০৭ আগস্ট ২০২৬, ০৫:১০ pm
৪৩
৫৫ বছরেও দেশে ফেরেনি শহিদ বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক আব্দুল ওয়াহাব তালুকদারের সমাধি

ভারতের সীমান্তে অযত্নে কবর, রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জোরালো

স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছিলেন তিনি। কিন্তু যে মাতৃভূমির জন্য শহিদ হয়েছিলেন, স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও সেই দেশের মাটিতে স্থান হয়নি তাঁর শেষ ঠিকানার। শহিদ বুদ্ধিজীবী, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যাপক আব্দুল ওয়াহাব তালুকদারের সমাধি আজও ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কুচবিহার জেলার বামনহাট সীমান্তসংলগ্ন কালমাটি মসজিদ চত্বরে পড়ে আছে। সংরক্ষণের অভাবে সমাধিটি এখন নদীভাঙনের হুমকির মুখে। ফলে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে তাঁর মরদেহ দেশে ফিরিয়ে এনে পুনঃসমাহিত করার দাবি আরও জোরালো হয়েছে।

পরিবার ও স্থানীয় সূত্র জানায়, মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে অধ্যাপক আব্দুল ওয়াহাব তালুকদার শিক্ষকতার পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। তিনি ৬ নম্বর সেক্টরের অধীনে ভারতের বামনহাট যুবশিবিরে ক্যাম্প ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করা, প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সমন্বয় এবং যুদ্ধ পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

১৯৭১ সালের ৭ আগস্ট ভূরুঙ্গামারীর শিংঝাড় এলাকার তৎকালীন বগনী রেলসেতুর কাছে পাকিস্তানি বাহিনীর অতর্কিত হামলায় গুরুতর আহত হন তিনি। পরে পাকিস্তানি সেনারা তাঁকে আটক করে। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, মুক্তিযুদ্ধ-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র পাওয়ার পর তাঁকে বেয়নেট দিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

সেই সময় সীমান্ত এলাকায় তীব্র গোলাবর্ষণের কারণে তাঁর মরদেহ বাংলাদেশে আনা সম্ভব হয়নি। পরে ভারতের কুচবিহার জেলার কালমাটি মসজিদ চত্বরে তাঁকে দাফন করা হয়। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পার হলেও তাঁর সমাধি আজও সেখানেই রয়ে গেছে।

শহিদ অধ্যাপক আব্দুল ওয়াহাব তালুকদারের পুত্র মিজান তালুকদার বলেন, “আমার বাবা দেশের জন্য জীবন দিয়েছেন। কিন্তু তাঁর কবর আজও বিদেশের মাটিতে। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে দেশে ফিরিয়ে এনে পুনঃসমাহিত করা হলে সেটিই হবে তাঁর প্রতি প্রকৃত সম্মান।”

চীনপ্রবাসী গবেষক ড. রোকনুজ্জামান কিরণ বলেন, “প্রতিবছর শহিদ বুদ্ধিজীবী দিবসে তাঁকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্মরণ করা হয়। অথচ তাঁর সমাধি অযত্নে পড়ে আছে। সংরক্ষণের অভাবে এটি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পরিবারের সদস্যদের জন্যও সেখানে যাওয়া বা সমাধির দেখভাল করা সহজ নয়।”

জয়মনিরহাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল ওয়াদুদ সরকার বলেন, “এটি শুধু একটি পরিবারের দাবি নয়; পুরো এলাকার মানুষের প্রত্যাশা। একজন শহিদ বুদ্ধিজীবীর সমাধি বিদেশের মাটিতে অবহেলায় পড়ে থাকা জাতির জন্যও বেদনাদায়ক। সরকারিভাবে তাঁর সমাধি দেশে এনে সংরক্ষণ করা উচিত।”

স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষক ও সচেতন নাগরিকদের মতে, নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তুলে ধরতে অধ্যাপক আব্দুল ওয়াহাব তালুকদারের আত্মত্যাগ যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। তাঁদের দাবি, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ভারত সরকারের সঙ্গে প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে তাঁর সমাধি বাংলাদেশে ফিরিয়ে এনে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় পুনঃসমাহিত করা হোক।

আজ তাঁর ৫৫তম শাহাদাতবার্ষিকীতে ভূরুঙ্গামারীর মানুষের প্রশ্ন—যে মানুষটি স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, তাঁর শেষ ঠিকানা কি কোনো দিন ফিরবে নিজের মাতৃভূমিতে?

Viewer Image
×
লিংক কপি করা হয়েছে!