সাইবার অপরাধের নতুন বিশ্বস্তরাস ‘ডিপফেক’: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আড়ালে তরুণী ও সাধারণ মানুষকে টার্গেট করছে আন্তর্জাতিক চক্র, নেপথ্যে কোটি কোটি টাকার ক্রিপ্টো-ব্ল্যাকমেইল সিন্ডিকেট
লেখা মোঃ হাসান আলী
তথ্যপ্রযুক্তির অভাবনীয় উৎকর্ষতা এবং চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এই স্বর্ণযুগে মানবসভ্যতার সামনে সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ হয়ে এসেছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI)। চিকিৎসাবিজ্ঞান, মহাকাশ গবেষণা থেকে শুরু করে দৈনন্দিন দাপ্তরিক কাজকে সহজ করতে এআই-এর ভূমিকা আজ অনস্বীকার্য। কিন্তু মুদ্রার ওপিঠের মতোই, এই আধুনিক এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল প্রযুক্তিই এখন আন্তর্জাতিক অপরাধী ও হ্যাকারদের হাতে রূপ নিয়েছে এক অদৃশ্য, মারাত্মক ও বিধ্বংসী মারণাস্ত্রে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে সাইবার অপরাধের এক নতুন এবং ভয়ঙ্কর ত্রাস হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে ‘ডিপফেক’ (Deepfake) প্রযুক্তি। অত্যন্ত নিখুঁত ও বাস্তবসম্মত উপায়ে একজনের ছবি, কণ্ঠস্বর বা ভিডিওকে অন্য একজনের শরীরে প্রতিস্থাপন করার এই প্রযুক্তিকে অপব্যবহার করে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক এক শক্তিশালী সাইবার অপরাধী চক্র দেশের সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে তরুণী, স্কুল-কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থী, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী এবং প্রভাবশালী নারীদের টার্গেট করছে। পর্দার আড়ালে বসে এই চক্রটি প্রতিনিয়ত তৈরি করছে কৃত্রিম পর্নোগ্রাফি বা বিকৃত কনটেন্ট, যা ব্যবহার করে চালানো হচ্ছে ব্ল্যাকমেইলিং ও কোটি কোটি টাকার চাঁদাবাজি। ‘দৈনিক সকালের সময়’-এর দীর্ঘ অনুসন্ধানে উন্মোচিত হয়েছে প্রযুক্তির আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই অন্ধকার জগতের আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক, যার ভয়াবহতা প্রচলিত যেকোনো সাইবার অপরাধকে ছাড়িয়ে গেছে এবং সমাজব্যবস্থাকে এক চরম নৈতিক ও মানসিক সংকটের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
এই অনুসন্ধানে নেমে হ্যাকারদের কাজ করার যে পদ্ধতি বা মডাস অপারেন্ডি পাওয়া গেছে, তা এককথায় সুনিপুণ, প্রাতিষ্ঠানিক এবং অত্যন্ত ভয়ঙ্কর। এই চক্রগুলোর আইটি উইং বা টেকনিক্যাল বিশেষজ্ঞরা সাধারণত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যেমন—ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, এক্স (সাবেক টুইটার) কিংবা টিকটক থেকে সাধারণ তরুণীদের পাবলিক প্রোফাইল কিংবা অসতর্কতাবশত শেয়ার করা সাধারণ ছবি, সেলফি ও ছোট ছোট ভিডিও ক্লিপ সংগ্রহ করে। অনেক সময় ভুক্তভোগীর অজান্তেই তাঁর প্রোফাইল পিকচার বা বন্ধুদের সাথে তোলা সাধারণ ছবি স্ক্রিনশট দিয়ে নিয়ে নেওয়া হয়। এরপর এই ছবিগুলোকে নিয়ে যাওয়া হয় ইন্টারনেটের অন্ধকার জগত বা ‘ডার্ক ওয়েব’ (Dark Web) এবং বিভিন্ন এনক্রিপ্টেড চ্যাট অ্যাপ্লিকেশন ও এআই পোর্টালে। সেখানে থাকা অত্যাধুনিক এআই ফেসসোয়াপ (Face-swap) সফটওয়্যার, ডিপফেক ল্যাব (DeepFaceLab) কিংবা বিভিন্ন ওপেন সোর্স জেনারেটিভ অ্যাডভারসারিয়াল নেটওয়ার্কের (GAN) মাধ্যমে সেই সাধারণ ছবিগুলোকে কোনো প্রাপ্তবছস্ক বা আপত্তিকর ভিডিওর মূল চরিত্রের মুখের ওপর নিখুঁতভাবে বসিয়ে দেওয়া হয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গভীর নিউরাল নেটওয়ার্কের কারণে স্কিন টোন, চোখের পলক, ঠোঁটের নড়াচড়া এবং মুখের অভিব্যক্তি এতটাই নিখুঁতভাবে মিলে যায় যে, সাধারণ মানুষের পক্ষে খালি চোখে বা ল্যাবের বিশেষ সফটওয়্যার ছাড়া এই জাল ভিডিও বা ছবি চেনা প্রায় অসম্ভব।
ভিডিওগুলো তৈরির পর শুরু হয় এই চক্রের দ্বিতীয় ধাপ, যাকে বলা হয় ‘সাইবার টেররিজম’। চক্রের সদস্যরা ভুয়া আইডির মাধ্যমে বা এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপ যেমন—টেলিগ্রাম বা হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করে সরাসরি ভুক্তভোগী বা তাঁর পরিবারের সদস্যদের ইনবক্সে সেই বিকৃত কনটেন্ট পাঠিয়ে দেয়। এরপর শুরু হয় মানসিক নির্যাতন এবং ব্ল্যাকমেইলিং। তারা দাবি করে মোটা অঙ্কের টাকা, যা অনেক সময় আন্তর্জাতিক ক্রিপ্টোকারেন্সি যেমন—বিটকয়েন (Bitcoin) বা ইউএসডিটি (USDT)-এর মাধ্যমে পরিশোধ করতে বলা হয়। টাকা না দিলে এই বিকৃত কনটেন্ট ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার, ভুক্তভোগীর আত্মীয়-স্বজনদের ফেসবুক ওয়ালে ট্যাগ করার এবং তাঁর সামাজিক ও পারিবারিক সম্মান ধূলিসাৎ করার আলটিমেটাম দেওয়া হয়। লোকলজ্জা, সামাজিক কলঙ্ক আর আত্মহত্যার ভয়ে অনেক মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত ভুক্তভোগী পরিবার শুরুতে পুলিশ বা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে না জানিয়ে নীরবে লাখ লাখ টাকা এই হ্যাকারদের হাতে তুলে দিচ্ছে। আর এই নীরবতার সুযোগেই এই চক্রগুলোর সাহস, নেটওয়ার্ক ও ব্যাপ্তি দিন দিন জ্যামিতিক হারে বেড়েই চলেছে।
বাংলাদেশ পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ডিভিশন, ডিবি এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে ‘ প্রতিবেদক জানতে পেরেছেন যে, এই অপরাধের শিকড় কেবল দেশের ভৌগোলিক সীমান্তের অভ্যন্তরেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি একটি পুরোদস্তুর বহুজাতিক সাইবার ক্রাইম সিন্ডিকেট। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, এই চক্রের মূল সার্ভার, ডেটা সেন্টার বা মূল মাস্টারমাইন্ডরা অবস্থান করছে পার্শ্ববর্তী দেশসহ পূর্ব ইউরোপ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া কিংবা নাইজেরিয়ার মতো আন্তর্জাতিক সাইবার অপরাধের চারণভূমিগুলোতে। তবে দেশীয় কিছু স্থানীয় তরুণ, আইটি ড্রপআউট বা ‘লোকাল এজেন্ট’ টাকার বিনিময়ে তাদের নির্দিষ্ট এলাকার বিত্তশালী বা টার্গেট করা তরুণীদের তথ্য, পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড এবং ছবি সংগ্রহ করে মূল আন্তর্জাতিক চক্রের কাছে সরবরাহ করে।
আন্তর্জাতিক এই সিন্ডিকেটের লেনদেনগুলো কোনো প্রথাগত বা বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে হয় না, যাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (BFIU) তাদের ধরতে না পারে। তারা অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার জন্য ব্যবহার করে ডিজিটাল ওয়ালেট, বেনামে বা ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে খোলা মোবাইল ব্যাংকিং (বিকাশ, রকেট, নগদ) অ্যাকাউন্ট। স্থানীয় এজেন্টরা এই টাকা ক্যাশ-আউট করার পর তা অবৈধ ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জারদের মাধ্যমে ডলারে রূপান্তর করে অথবা ‘ডিজিটাল হুন্ডি’র মাধ্যমে দেশ থেকে সরাসরি বিদেশে পাচার করে দেয়। এর ফলে অপরাধীদের প্রকৃত আইপি অ্যাড্রেস ও ভৌগোলিক অবস্থান শনাক্ত করা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আইটি বিশেষজ্ঞদের জন্য একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই মারাত্মক ও আধুনিক সাইবার অপরাধের আইনগত প্রতিকার, প্রতিরোধ এবং এর গভীর আইনি ব্যাখ্যা নিয়ে দেশের শীর্ষস্থানীয় সাইবার আইন বিশেষজ্ঞ, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার আইন কর্মকর্তাদের সাথে বিস্তারিত আলোচনা করেছে ‘দৈনিক সকালের সময়’। আইনবিদদের মতে, বাংলাদেশে ডিপফেক প্রযুক্তির মাধ্যমে কারও ছবি বিকৃত করা, পর্নোগ্রাফি তৈরি করা বা ব্ল্যাকমেইল করে টাকা দাবি করা সম্পূর্ণভাবে অ-জামিনযোগ্য এবং গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ। দেশের প্রচলিত আইনে এই ধরনের অপরাধীদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির স্পষ্ট বিধান রয়েছে।
প্রথমত, সাইবার নিরাপত্তা আইন (Cyber Security Act)-এর বিভিন্ন ধারা অনুযায়ী, যদি কোনো ব্যক্তি অনুমতি ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তির ডিজিটাল তথ্য উপাত্ত বা ছবি সংগ্রহ করে তা বিকৃত করে, ডিজিটাল জালিয়াতি বা ফেক আইডি তৈরি করে কিংবা ইন্টারনেটে মানহানিকর ও আপত্তিকর কোনো কনটেন্ট প্রচার বা প্রকাশ করে, তবে তা সরাসরি আমলযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। অপরাধের ধরণ ও তীব্রতা ভেদে এই আইনের বিভিন্ন ধারায় অপরাধীর সর্বোচ্চ ৫ থেকে ৭ বছরের কারাদণ্ড এবং ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। যদি একই অপরাধ দ্বিতীয়বার করা হয়, তবে শাস্তির মেয়াদ আরও বৃদ্ধি পাবে।
দ্বিতীয়ত, ডিপফেক অপরাধের বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী এবং কঠোর আইনি হাতিয়ার হলো পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১২। এই আইনের ধারা ৪ এবং ৫-এর স্পষ্ট ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি কোনো নারী, পুরুষ বা শিশুর ছবি বা ভিডিও কোনো ডিজিটাল বা কৃত্রিম প্রযুক্তির (যেমন এআই) মাধ্যমে বিকৃত করে পর্নোগ্রাফি বা কোনো চাক্ষুষ ও শ্রাব্য আপত্তিকর কনটেন্ট তৈরি করে, তা ইন্টারনেটে বা যেকোনো মাধ্যমে প্রকাশ করে, কিংবা তা দেখিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন, ব্লাকমেইল বা চাঁদাবাজি করে, তবে সেটি একটি অ-জামিনযোগ্য গুরুতর অপরাধ। এই আইনের অধীনে অপরাধীর সর্বোচ্চ ৭ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড এবং ২ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের স্পষ্ট বিধান রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভুক্তভোগীরা যদি লোকলজ্জার ভয় ভেঙে সঠিক সময়ে প্রমাণের স্ক্রিনশট ও ইউআরএল (URL) নিয়ে আইনের আশ্রয় নেন, তবে এই আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে অপরাধীদের দ্রুততম সময়ে ট্রায়ালের মুখোমুখি করে জেলে পাঠানো সম্ভব।
ডিজিটাল
এর পাশাপাশি, এআই ব্ল্যাকমেইলিংয়ের মাধ্যমে যখন অর্থ দাবি করা হয়, তখন প্রচলিত দণ্ডবিধির বা পেনাল কোডের ধারা ৩৮৩ (চাঁদাবাজি বা Extortion) এবং ধারা ৫০৬ (অপরাধমূলক হুমকি বা Criminal Intimidation)-এর অধীনেও মামলা দায়ের করা যায়। চাঁদাবাজির অপরাধ প্রমাণিত হলে আসামির সর্বোচ্চ ৩ বছর পর্যন্ত যেকোনো মেয়াদের কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।
কেবল কঠোর আইন প্রণয়ন বা পুলিশের ঝটিকা অভিযানের মাধ্যমে এই আধুনিক ও অদৃশ্য সাইবার ব্যাধি সম্পূর্ণ নির্মূল করা সম্ভব নয় বলে মনে করছেন প্রযুক্তিবিদ, সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধ বিশেষজ্ঞরা। ‘দৈনিক সকালের সময়’-এর সাথে আলাপকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের একজন অধ্যাপক জানান, এই সংকট থেকে বাঁচতে হলে পারিবারিক সচেতনতা এবং ‘ডিজিটাল লিটারেসি’ বা প্রযুক্তিগত জ্ঞান বাড়ানো সবচেয়ে বেশি জরুরি।
সাইবার বিশেষজ্ঞ জয় কর্মকার
বলেন ডিপফেক ব্ল্যাকমেইলের শিকার হলে প্রথম কাজ হলো আতঙ্কিত না হওয়া। অপরাধীরা মূলত ভুক্তভোগীর ভয় ও সামাজিক লজ্জাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। তারা চায় ভুক্তভোগী ভয় পেয়ে চুপ থাকুক এবং টাকা দিতে রাজি হোক। কিন্তু এক টাকাও দেওয়া যাবে না একবার টাকা দিলে তাদের দাবি আরও বেড়ে যায়, থামে না। তাৎক্ষণিকভাবে অপরাধীর আইডি লিঙ্ক, মেসেজের স্ক্রিনশট ও অডিও রেকর্ড সংরক্ষণ করে নিকটস্থ থানায়, জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ অথবা পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ডিভিশনের হেল্পলাইনে সরাসরি অভিযোগ করুন। সেখানে ভুক্তভোগীর পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন রেখে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
আগে থেকে সতর্ক থাকাটাই সবচেয়ে বড় সুরক্ষা। সামাজিক মাধ্যমে ব্যক্তিগত ছবি, পারিবারিক মুহূর্ত ও ভিডিও শেয়ারে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম প্রোফাইল সবসময় লক রাখুন, অপরিচিত বা সন্দেহজনক ফলোয়ার রিকোয়েস্ট গ্রহণ করবেন না। অনেকে জানেন না যে প্রোফাইল পিকচার বা বন্ধুদের সাথে তোলা সাধারণ একটি ছবিই অপরাধীদের কাছে যথেষ্ট। সবচেয়ে বড় বিপদ হলো থার্ড-পার্টি এআই অ্যাপে নিজের ছবি আপলোড করা এই অ্যাপগুলোর অনেকগুলোই ব্যবহারকারীর ডেটা চুরি করে ডার্ক ওয়েবে বিক্রি করে দেয়। যেকোনো অপরিচিত লিঙ্কে ক্লিক করার আগেও দশবার ভাবুন।
বাংলাদেশে এই অপরাধের বিরুদ্ধে যথেষ্ট কঠোর আইন রয়েছে। সাইবার নিরাপত্তা আইন এবং পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১২ অনুযায়ী ডিপফেক কনটেন্ট তৈরি, প্রচার বা ব্ল্যাকমেইলের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ অ-জামিনযোগ্য গুরুতর অপরাধ। অপরাধী সর্বোচ্চ ৭ বছরের কারাদণ্ড পেতে পারে। এছাড়া দণ্ডবিধির চাঁদাবাজি ও অপরাধমূলক হুমকির ধারায়ও আলাদা মামলা করা যায়। ভুক্তভোগী সঠিক সময়ে প্রমাণ নিয়ে এগিয়ে আসলে অপরাধীকে দ্রুত বিচারের মুখোমুখি করা সম্ভব।
সবশেষে একটাই কথা অপরাধীর মূল শক্তি হলো ভুক্তভোগীর ভয় এবং সামাজিক লজ্জা। পরিবার ও সমাজ যদি ভুক্তভোগীর পাশে দাঁড়ায় এবং ভয়কে জয় করে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া যায়, তাহলেই এই অপরাধী চক্রকে থামানো সম্ভব। মনে রাখবেন, লজ্জা ভুক্তভোগীর নয় লজ্জা অপরাধীর।
প্রযুক্তিবিদদের পরামর্শ অনুযায়ী, তরুণ-তরুণী এবং সাধারণ ব্যবহারকারীদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজেদের ব্যক্তিগত ছবি, পারিবারিক মুহূর্ত ও ভিডিও শেয়ার করার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। বিশেষ করে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম প্রোফাইল লক রাখা, ‘ফলোয়ার’ অপশন সীমিত করা এবং কোনো অপরিচিত বা সন্দেহভাজন আইডির রিকোয়েস্ট গ্রহণ না করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। ইন্টারনেটে কোনো লিঙ্কে ক্লিক করার আগে বা কোনো আনভেরিফাইড থার্ড-পার্টি এআই অ্যাপে নিজের ছবি আপলোড করার আগে দশবার ভাবতে হবে, কারণ এই অ্যাপগুলোই অনেক সময় ব্যবহারকারীর ডেটা চুরি করে ডার্ক ওয়েবে বিক্রি করে দেয়।
প্রতিবেদনের শেষ প্রান্তে এসে ভুক্তভোগীদের উদ্দেশ্যে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার বার্তা অত্যন্ত পরিষ্কার—কোনো কারণে কেউ যদি এই ধরনের ডিপফেক ব্ল্যাকমেইলিংয়ের শিকার হন, তবে মানসিকভাবে ভেঙে পড়া বা লোকলজ্জার ভয়ে আত্মহননের মতো পথ বেছে নেওয়া যাবে না। অপরাধীদের এক টাকাও দেওয়া যাবে না, কারণ একবার টাকা দিলে তাদের দাবির পরিমাণ আরও বেড়ে যায়। তাৎক্ষণিকভাবে অপরাধীর আইডি লিঙ্ক, মেসেজের স্ক্রিনশট এবং অডিও রেকর্ড সংরক্ষণ করে নিকটস্থ থানায় অথবা জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ যোগাযোগ করতে হবে। এছাড়া বাংলাদেশ পুলিশের বিশেষায়িত উইং ‘সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ডিভিশন’-এর অফিশিয়াল ফেসবুক পেজ বা হেল্পলাইনে সরাসরি অভিযোগ জানানো যাবে, যেখানে ভুক্তভোগীর পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন রেখে অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে অপরাধীদের শনাক্ত ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়। মনে রাখতে হবে, অপরাধীর মূল শক্তিই হলো ভুক্তভোগীর ভয় এবং সামাজিক লজ্জা। সমাজ ও পরিবার যদি ভুক্তভোগীর পাশে এসে দাঁড়ায় এবং ভয়কে জয় করে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা যায়, তবেই কেবল এই আন্তর্জাতিক ডিজিটাল অপরাধী চক্রের বিষদাঁত উপড়ে ফেলা সম্ভব।
লেখা: সাংবাদিক ও কলামিস্ট