টঙ্গী, গাজীপুর প্রতিনিধি-
তানিয়া আক্তার ফারজানা
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান, দর্শন ও সংস্কৃতি চিন্তাকে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন সংগীতজ্ঞ সন্জীদা খাতুন ও ওয়াহিদুল হক। রবীন্দ্রসংগীতের চর্চা, পরিবেশন ও শিক্ষার মধ্য দিয়ে তাঁরা শুধু সংগীত চর্চাই করেননি, বরং বাঙালির সাংস্কৃতিক চেতনা গঠনের আন্দোলনেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। আজিমপুরের সরকারি কোয়ার্টার্সে তাঁদের সংসারজীবনের পাশাপাশি চলত গান ও সংস্কৃতি নিয়ে গভীর সাধনা। ওয়াহিদুল হক ছিলেন পেশায় সাংবাদিক; অন্যদিকে সন্জীদা খাতুন ছিলেন শিক্ষক ও রবীন্দ্রসাহিত্যের নিবিড় অনুরাগী। দুজনেরই সবচেয়ে গভীর অনুরাগের জায়গা ছিল সংগীত, বিশেষ করে রবীন্দ্রসংগীত।
রবীন্দ্রনাথের গানকে কেন্দ্র করে তাঁদের চর্চা পরবর্তী সময়ে ছায়ানট প্রতিষ্ঠার কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়। বাঙালিকে নিজের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য নিয়ে আত্মবিশ্বাসী করে তুলতে গানকে তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেন। মানুষের কাছে পৌঁছাতে নানা সাংস্কৃতিক আয়োজনের পাশাপাশি বাংলা বর্ষবরণসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক উদ্যোগে তাঁদের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।
রবীন্দ্রসংগীতের ব্যাখ্যা ও পরিবেশনায় অবশ্য সন্জীদা খাতুন ও ওয়াহিদুল হকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য ছিল। ওয়াহিদুল হক সংগীতের সুর, রাগরূপ ও স্বরের চলনের দিকে বেশি মনোযোগী ছিলেন। অন্যদিকে সন্জীদা খাতুন গুরুত্ব দিতেন গানের বাণী, আবেগ, উচ্চারণ, শ্বাস-প্রশ্বাস ও অভিব্যক্তির ওপর। তাঁর মতে, গানের প্রতিটি বাক্য ও বাক্যাংশের অর্থ যথাযথভাবে ফুটিয়ে তোলার মধ্যেই রবীন্দ্রসংগীতের সৌন্দর্য প্রকাশ পায়। তবে মতপার্থক্য থাকলেও রবীন্দ্রনাথের স্বরলিপি ও গানের মূল সুরের প্রতি দুজনেরই ছিল গভীর শ্রদ্ধা। তাঁরা মনে করতেন, স্বরলিপি গানের কাঠামো নির্দেশ করে; কিন্তু একজন শিল্পীর কণ্ঠ, আবেগ ও অভিব্যক্তিই সেই গানকে জীবন্ত করে তোলে।
সন্জীদা খাতুনের রবীন্দ্রসংগীতচর্চার পেছনে ছিল দীর্ঘ সংগীতশিক্ষা ও রবীন্দ্রসাহিত্যের নিবিড় পাঠ। নজরুলগীতি, রাগসংগীত ও রবীন্দ্রসংগীতের বিভিন্ন ধারার সঙ্গে পরিচয়ের পাশাপাশি শান্তিনিকেতনে তাঁর অধ্যয়ন তাঁর সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও গভীর করে। ওয়াহিদুল হকের সঙ্গে যৌথভাবে তিনি রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদ, বিশ্বজনীনতা ও বাঙালি সংস্কৃতির চেতনাকে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার কাজে যুক্ত হন। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধের সময় গান ও সংস্কৃতির মাধ্যমে মানুষকে উজ্জীবিত করা এবং স্বাধীন দেশে সাংস্কৃতিক চর্চাকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রেও তাঁদের অবদান স্মরণীয়।
রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির বৈচিত্র্য নিয়েও তাঁরা গভীরভাবে কাজ করেছেন। ভারতীয় ধ্রুপদ, খেয়াল ও টপ্পার পাশাপাশি বাউল, লোকসংগীত ও বিদেশি সুরের প্রভাব রবীন্দ্রসংগীতে কীভাবে এসেছে, তা নিয়েও তাঁদের চর্চা ছিল। রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির এই বহুমাত্রিকতা বাঙালির সংগীত চেতনায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। দীর্ঘদিনের সাধনা ও মতপার্থক্য সত্ত্বেও সন্জীদা খাতুন ও ওয়াহিদুল হক ছিলেন রবীন্দ্রসংগীতের দুই নিবেদিতপ্রাণ সাধক। রবীন্দ্রনাথের গানকে অবলম্বন করে বাঙালির সংস্কৃতি, মানবতা ও আত্মপরিচয়ের বোধকে সমৃদ্ধ করার ক্ষেত্রে তাঁদের অবদান বাংলা সংগীত ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
তানিয়া আক্তার ফারজানা