টঙ্গী, গাজীপুর প্রতিনিধি-
তানিয়া আক্তার ফারজানা
মাছ-মাংসের দাম বেশি এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। তবে এবার নিত্যদিনের রান্নার অন্যতম প্রধান উপকরণ সবজিও যেন ক্রেতাদের জন্য বাড়তি বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজধানীর বাজারগুলোতে বেশির ভাগ সবজির দাম এখনো চড়া। ফলে মাছ-মাংসের পাশাপাশি সবজি কিনতেও হিসাব কষতে হচ্ছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষকে। শুক্রবার সকালে রাজধানীর মিরপুর-৬ কাঁচাবাজারে গিয়ে দেখা যায়, বাজারে ক্রেতাদের বড় একটি অংশই দাম শুনে পরিমাণ কমিয়ে সবজি কিনছেন। কেউ এক কেজির বদলে আধা কেজি, আবার কেউ ২৫০ গ্রাম করে সবজি নিচ্ছেন। অনেকে আবার দাম শুনে প্রয়োজনীয় কিছু সবজি না কিনেই ফিরে যাচ্ছেন।
বাজার করতে আসা এক ক্রেতা বলেন, আগে মাছ বা মাংস কিনলেই বেশি টাকা খরচ হতো। এখন চার-পাঁচ ধরনের সবজি কিনতেই ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা চলে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘বাসায় দুই সন্তান। প্রতিদিনই সবজি লাগে। আগে এক হাজার টাকায় তিন-চার দিনের বাজার করা যেত। এখন সেই টাকার বড় একটা অংশ শুধু সবজি কিনতেই চলে যাচ্ছে। বাধ্য হয়ে কম কিনছি, আবার অনেক সবজি কিনতেই পারছি না।’ বাজারে আসা অন্য ক্রেতাদেরও একই অভিযোগ। তাদের ভাষ্য, সবজির দাম বাড়ায় পরিবারের খাবারের তালিকা ছোট করতে হচ্ছে। বিশেষ করে সীমিত আয়ের পরিবারগুলোতে একসঙ্গে কয়েক ধরনের সবজি কেনা কঠিন হয়ে পড়েছে।
মিরপুর-৬ কাঁচাবাজারে ঝিঙে, বেগুন, কাঁকরোল ও পটোল বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি প্রায় ৮০ টাকায়। করলা ও ঢ্যাঁড়শের দাম ১০০ টাকা কেজি। সবজির মধ্যে তুলনামূলক বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে শিম। প্রতি কেজি শিমের দাম ১৮০ থেকে ২২০ টাকা। টমেটো ১৩০ থেকে ১৫০ টাকা এবং গাজর ১১০ থেকে ১৩০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। তুলনামূলক কম দামে পাওয়া যাচ্ছে আলু ও কাঁচা পেঁপে। আলু প্রতি কেজি ৩৫ থেকে ৪০ টাকা এবং কাঁচা পেঁপে ৩০ থেকে ৪০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। কাঁচামরিচের দাম কিছুটা কমলেও অন্যান্য সবজির দামে এর তেমন কোনো প্রভাব পড়েনি। ফলে বাজারে স্বস্তি ফেরেনি বলে জানিয়েছেন ক্রেতারা।
একই বাজারে এক গৃহিণী এক দোকান থেকে আরেক দোকানে ঘুরে সবজির দাম যাচাই করছিলেন। শেষ পর্যন্ত কয়েক ধরনের সবজি আধা কেজি করে কিনে বাজার শেষ করেন। তিনি বলেন, ‘আগে এক কেজি করে সবজি কিনতাম। এখন আধা কেজি করে কিনছি। সংসারের খরচ এত বেড়েছে যে সবজির দামই এখন সবচেয়ে বেশি ভাবাচ্ছে। মাছ-মাংস না কিনলেও চলবে, কিন্তু সবজি তো প্রতিদিনই লাগবে।’
ক্রেতাদের অনেকেই বলছেন, বাজারে সবজির দাম বাড়লেও আয় একই থাকায় তাদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। ফলে পরিবারের প্রয়োজন অনুযায়ী বাজার করা সম্ভব হচ্ছে না। বাজারের বিক্রেতাদের দাবি, টানা বৃষ্টি ও বন্যার কারণে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে ঢাকায় আগের মতো সবজি আসছে না। এতে সরবরাহ কমে যাওয়ায় পাইকারি বাজারেই দাম বেড়েছে। সেই বাড়তি দামের প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারে।
মিরপুর-৬ কাঁচাবাজারের এক সবজি বিক্রেতা বলেন, পাইকারি বাজার থেকেই বেশি দামে সবজি কিনে আনতে হচ্ছে। ক্রেতাদের সঙ্গে দাম নিয়ে কথা কাটাকাটি হলেও তাদের বেশি দামে বিক্রি করার সুযোগ নেই। তিনি বলেন, ‘টানা বৃষ্টি আর উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি এলাকায় বন্যার কারণে আগের মতো সবজি আসছে না। সরবরাহ কম থাকায় পাইকারি বাজারেই দাম বেড়েছে। সেই বাড়তি দামেই আমাদের বিক্রি করতে হচ্ছে। আমরাও চাই বাজার স্বাভাবিক হোক, তাহলে বিক্রিও বাড়বে।’ আরেক বিক্রেতা বলেন, এখন অনেক ক্রেতাই এক কেজির বদলে আধা কেজি বা ২৫০ গ্রাম করে সবজি কিনছেন। কেউ কেউ দাম শুনেই চলে যাচ্ছেন। ফলে আগের তুলনায় বিক্রি কমেছে।
ব্যবসায়ীদের মতে, বাজারে সবজির সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত দাম দ্রুত কমার সম্ভাবনা কম। বৃষ্টি ও বন্যার কারণে উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে সময় লাগতে পারে। অন্যদিকে ক্রেতাদের প্রত্যাশা, সরবরাহ বাড়ানো এবং বাজার তদারকি জোরদারের মাধ্যমে দ্রুত সবজির দাম নিয়ন্ত্রণে আনা হবে। কারণ মাছ-মাংসের বিকল্প হিসেবে অনেক পরিবার সবজির ওপর নির্ভর করলেও দাম বেড়ে যাওয়ায় সেই পথও এখন কঠিন হয়ে পড়ছে। সবজির বাজারের এই ঊর্ধ্বগতিতে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন সীমিত আয়ের মানুষ। তাদের আশঙ্কা, বাজারে দ্রুত স্বস্তি না ফিরলে দৈনন্দিন খাবারের খরচ আরও বাড়বে এবং পরিবারের পুষ্টিকর খাবারের তালিকায় কাটছাঁট করতে হবে।