তানিয়া আক্তার ফারজানা
বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেতা রবি ঘোষ তাঁর অনবদ্য অভিনয়, নিখুঁত কমেডি টাইমিং এবং বহুমাত্রিক চরিত্রাভিনয়ের মাধ্যমে আজও দর্শকের হৃদয়ে অম্লান। হাস্যরসাত্মক চরিত্রে অসাধারণ সাফল্য পেলেও গম্ভীর ও চরিত্রধর্মী অভিনয়েও তিনি রেখে গেছেন অনন্য স্বাক্ষর। বাংলা সিনেমা, নাটক এবং টেলিভিশনে তাঁর অবদান আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়। ১৯৩১ সালের ২৪ নভেম্বর ব্রিটিশ ভারতের কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন রবি ঘোষ। তাঁর পুরো নাম ছিল রবীন্দ্রনাথ ঘোষ দস্তিদার। শিক্ষাজীবন শেষে কর্মজীবনে প্রবেশ করলেও অভিনয়ের প্রতি গভীর ভালোবাসাই তাঁকে টেনে আনে মঞ্চনাটকে। সেখান থেকেই শুরু হয় তাঁর অভিনয়জীবনের পথচলা।
পঞ্চাশের দশকের শেষ দিকে চলচ্চিত্রে অভিষেকের পর ধীরে ধীরে নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখতে শুরু করেন তিনি। পরিচালক তপন সিনহার ‘গল্প হলেও সত্যি’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করে দর্শকের নজর কেড়ে নেন। তবে ১৯৬৮ সালে সত্যজিৎ রায় পরিচালিত ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ চলচ্চিত্রে ‘বাঘা’ চরিত্রে অভিনয় তাঁকে এনে দেয় ব্যাপক জনপ্রিয়তা ও আন্তর্জাতিক পরিচিতি। পরবর্তীতে ‘হীরক রাজার দেশে’, ‘বসন্ত বিলাপ’, ‘মৌচাক’, ‘ধন্যি মেয়ে’, ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’, ‘আগন্তুক’, ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ এবং ‘গুপী বাঘা ফিরে এলো’সহ অসংখ্য জনপ্রিয় চলচ্চিত্রে অভিনয় করে বাংলা চলচ্চিত্রকে সমৃদ্ধ করেছেন তিনি।
অভিনয়ের পাশাপাশি রবি ঘোষ ছিলেন একজন দক্ষ মঞ্চশিল্পী এবং পরিচালক। ‘নিধিরাম সর্দার’ চলচ্চিত্র পরিচালনার পাশাপাশি তিনি থিয়েটার আন্দোলনের সঙ্গেও সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্রে নিয়মিত অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি ভারতীয় সিনেমার অন্যতম সেরা চরিত্রাভিনেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। ১৯৭০ সালে ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ চলচ্চিত্রের সুবাদে বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবেও অংশগ্রহণ করেন তিনি। তাঁর অভিনয়শৈলী শুধু ভারতেই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রশংসিত হয়।
দীর্ঘ অভিনয়জীবনে অসংখ্য সম্মাননা অর্জন করেন রবি ঘোষ। ১৯৯৮ সালে মৃত্যুর পর ‘নয়নতারা’ চলচ্চিত্রের জন্য তিনি আনন্দলোক অ্যাওয়ার্ডে সম্মানিত হন। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে কলাকার অ্যাওয়ার্ডসহ একাধিক পুরস্কারে ভূষিত হন। ১৯৯৭ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তবে তাঁর অসাধারণ অভিনয়, প্রাণবন্ত হাস্যরস এবং কালজয়ী চরিত্রগুলো আজও বাংলা চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছে সমান জনপ্রিয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম তাঁর অভিনয় থেকে আনন্দ ও অনুপ্রেরণা পেয়ে চলেছে।
বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে রবি ঘোষ শুধু একজন অভিনেতা নন, তিনি এক জীবন্ত কিংবদন্তি যাঁর সৃষ্টি ও অবদান বাংলা সংস্কৃতির এক অমূল্য সম্পদ হয়ে থাকবে।
তানিয়া আক্তার ফারজানা