অনলাইন বৃহস্পতিবার, ০৬ আগস্ট ২০২৬
ঢাকার আগারগাঁওয়ে চীন-মৈত্রী আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আজ বুধবার, ৫ আগস্ট, জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য ছিল ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে নিহত পরিবারের সদস্য ও জুলাই আন্দোলনে আহতদের রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মান জানানো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠানটি আলোচনায় আসে সম্পূর্ণ ভিন্ন কারণে।
রাষ্ট্রীয়ভাবে নির্মিত একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া তীব্র হট্টগোল, ‘ভুয়া, ভুয়া’ স্লোগান, বিদেশি কূটনীতিকদের অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ এবং ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদের প্রকাশ্য ক্ষোভ—সব মিলিয়ে জাতীয় ঐক্যের বার্তা দেওয়ার পরিবর্তে দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও শৃঙ্খলা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় আয়োজনটিতে সরকারের উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের পাশাপাশি জুলাই আন্দোলনে নিহত পরিবারের সদস্য, আহত আন্দোলনকারী, ছাত্রনেতা, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি এবং ঢাকায় কর্মরত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকেরা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে জুলাই আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায় নিয়ে নির্মিত একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। কিন্তু প্রদর্শনী শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দর্শকসারির একটি অংশ ক্ষোভ প্রকাশ করতে শুরু করে।
উপস্থিত ব্যক্তিদের অভিযোগ ছিল, প্রামাণ্যচিত্রটিতে জুলাই আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ কিছু ঘটনা যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়নি। বিশেষ করে ৩ আগস্টের ঘটনাপ্রবাহ প্রায় সম্পূর্ণ অনুপস্থিত রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে আন্দোলনের প্রথম নিহত আবু সাঈদের ছবি নেই বলেও অভিযোগ ওঠে। আরও অভিযোগ করা হয়, বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ভূমিকাও তথ্যচিত্রে প্রতিফলিত হয়নি। এসব অভিযোগ সামনে আসতেই নিহত পরিবারের কয়েক সদস্য এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা-কর্মীদের একটি অংশ উচ্চস্বরে প্রতিবাদ শুরু করেন। একপর্যায়ে তারা ‘ভুয়া, ভুয়া’ স্লোগান দিতে থাকেন।
পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। অনুষ্ঠান পরিচালনাকারী উপস্থাপক বারবার সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানান। কিন্তু তাতে পরিস্থিতির খুব বেশি উন্নতি হয়নি। বিশৃঙ্খলা বাড়তে থাকলে ঢাকায় কর্মরত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক ও দূতাবাসের কর্মকর্তাদের একটি অংশ অনুষ্ঠানস্থল ছেড়ে চলে যান। নিরাপত্তার স্বার্থে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তায় নিয়োজিত সদস্যরা মঞ্চের সামনে অবস্থান নেন।
সরকারের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান। তিনি উপস্থিত ব্যক্তিদের শান্ত হওয়ার আহ্বান জানান। তবে একপর্যায়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন বলেন, ‘আপনারা এখানে নিজেকে জাহির করতে আসছেন।’ তার এই মন্তব্যের পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ মঞ্চে উঠে আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে বলেন, যাদের বক্তব্য দেওয়ার প্রয়োজন আছে, তারা যেন মঞ্চে এসে কথা বলেন। এরপর তিনি এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেনকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ করে দেন।
মঞ্চে উঠে আখতার হোসেন বলেন, প্রদর্শিত প্রামাণ্যচিত্রে বহু অসংগতি রয়েছে। বিশেষ করে ৩ আগস্টের ঘটনাপ্রবাহ যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়নি। তিনি বলেন, এসব বিষয় সরকারের নজরে আনা হবে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হবে। একই সঙ্গে তিনি শহীদ পরিবারের প্রতি সম্মান জানিয়ে সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানান।
এরপর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান বক্তব্য দিয়ে বলেন, প্রামাণ্যচিত্রে কোনো অসংগতি থাকলে তা সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে সংশোধন করা হবে। এতে কেউ কষ্ট পেয়ে থাকলে তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন। সরকারের পক্ষ থেকে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনার আশ্বাসও দেন তিনি।
তবে পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হওয়ার আগেই বিদেশি অতিথিদের একটি বড় অংশ অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করেন। রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে বিদেশি কূটনীতিকদের এভাবে বেরিয়ে যাওয়ার ঘটনা উপস্থিত অনেকের মধ্যেই অস্বস্তির সৃষ্টি করে।
এরপর বক্তব্য দিতে গিয়ে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ তার ক্ষোভ ও হতাশার কথা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, সকালে তিনি আরেকটি সুন্দর অনুষ্ঠান দেখেছেন, যেখানে মানুষের ঐক্য ছিল। কিন্তু এই অনুষ্ঠানে একটি প্রামাণ্যচিত্রের ভুলকে কেন্দ্র করে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তা অত্যন্ত দুঃখজনক।
তিনি বলেন, ‘আবু সাঈদের ছবিই দেখলাম না। ভুল হতেই পারে। কিন্তু এ জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ক্ষমা চাওয়ার পরও যে ঘটনা ঘটল, তা অনভিপ্রেত। জাতীয় অনুষ্ঠানে এমন ঘটনা মোটেই কাম্য ছিল না।’
বিদেশি অতিথিদের প্রসঙ্গ টেনে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘বিদেশি অতিথিরা অনুষ্ঠান ছেড়ে চলে গেলেন। এটি তো ভালো দেখাল না। আমরা জাতীয় ঐক্য দেখাতে পারলাম না। সংসদ ভবনের মতো এখানে ওয়াকআউট করা একেবারেই শোভনীয় ছিল না।’
বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, ‘রাষ্ট্রপতির সামনে “ভুয়া, ভুয়া” স্লোগান দেওয়া কোনোভাবেই মানানসই নয়। আমরা তো জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে এখানে এসেছি, উড়ে এসে জুড়ে বসিনি। ভুল করলে শুধরে দেবেন, কিন্তু বিশৃঙ্খলা করে কোনো লাভ নেই।’
ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি তার বক্তব্যে বিদেশিদের সামনে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘বিদেশিদের সামনে হেনস্তা হলাম, খুব ব্যথিত হয়েছি।’ তার ভাষায়, মানুষের ভুল হতে পারে, কিন্তু সেই ভুল সংশোধনের একটি শালীন পদ্ধতি রয়েছে। রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে চিৎকার-চেঁচামেচি ও বিশৃঙ্খলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
তিনি আরও বলেন, ‘আজকের এ ঘটনায় সবচেয়ে খুশি হবেন যিনি পাশের দেশে বসে আছেন, তার জন্য এটি অত্যন্ত আনন্দের একটি দিন।’ যদিও তিনি কারও নাম উল্লেখ করেননি, তার বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে।
রাজনৈতিক অবস্থানও স্পষ্ট করেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার এবং এই সরকার আওয়ামী লীগের মতো হতে চায় না। আওয়ামী লীগের সমালোচনা করে তিনি বলেন, দলটির কোনো অনুশোচনা নেই। তারা দেশে ফেরার ঘোষণা দিচ্ছে। তার ভাষায়, ‘আসেন, দেখা হবে রাজপথে।’
একই সঙ্গে তিনি জুলাই আন্দোলনে নিহতদের পরিবারের দায়িত্ব নেওয়ার বিষয়ে সরকারের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, শহীদ পরিবারের সম্মান রক্ষা, আহতদের উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং যারা চোখ বা অঙ্গ হারিয়েছেন, তাদের পুনর্বাসন করা সরকারের সবচেয়ে পবিত্র দায়িত্ব।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে এমন বিশৃঙ্খলা দেশের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি সম্পর্কে বিদেশি কূটনীতিকদের সামনে নেতিবাচক বার্তা দিয়েছে। বিশেষ করে জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হওয়ার কথা ছিল যে অনুষ্ঠান, সেটি পরিণত হয়েছে প্রকাশ্য বিরোধ ও অসন্তোষের মঞ্চে। সরকারপক্ষ ভুল স্বীকার করে সংশোধনের আশ্বাস দেওয়ার পরও পরিস্থিতি শান্ত না হওয়ায় অনেকেই এটিকে রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন।
অন্যদিকে আন্দোলনকারীদের একটি অংশের দাবি, জুলাই আন্দোলনের ইতিহাস বিকৃত করা হলে তা মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। তাদের মতে, রাষ্ট্রীয়ভাবে নির্মিত কোনো প্রামাণ্যচিত্রে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বা ব্যক্তিদের বাদ পড়া শুধু একটি কারিগরি ত্রুটি নয়; বরং ইতিহাস সংরক্ষণের প্রশ্নের সঙ্গে এটি জড়িত। তাই তাদের প্রতিবাদ ছিল ন্যায্য। তবে একই সঙ্গে অনেকেই মনে করেন, প্রতিবাদের ভাষা ও পদ্ধতি এমন হওয়া উচিত ছিল, যাতে রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানের মর্যাদা এবং দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
সব মিলিয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবসের রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান শেষ পর্যন্ত নিহতদের পরিবারের সম্মাননা বা আন্দোলনের স্মৃতিচারণের চেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে বিশৃঙ্খলা, রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বিদেশি কূটনীতিকদের সামনে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিভাজনের প্রকাশ্য চিত্রের জন্য। যে আয়োজনে জাতীয় ঐক্যের বার্তা দেওয়ার কথা ছিল, সেখান থেকেই বিদেশি অতিথিরা নিয়ে গেলেন ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা—যা দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উত্থাপন করেছে।নবনীতা রায়
মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার কোন দায় ডিজিটালকতৃপক্ষ দায়ী নন
নিউজ ডেস্ক