আপনারা হয়তো ঠিক অনুমান করতে পারবেন না—যে মানুষটি সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত প্রতিটা মুহূর্ত চরম মৃত্যুভয়ে, এক অজানা আতঙ্কে পার করেছে; বিকেলের শেষবেলায় এসে সেই মানুষটিই নিয়তির এক অদ্ভুত খেলায় হয়ে উঠলাম যেন পুরো জাতির ত্রাণকর্তা, রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার শেষ ভরসা।
সাবেক রাষ্ট্রপতি নিজেই স্বীকার করলেন—"সেদিন সংবিধান অক্ষরে অক্ষরে মানা সম্ভব ছিল না।" এরপর তিনি জানালেন, কেন সেই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছিলেন।
আমি সাবেক রাষ্ট্রপতির কাছে জানতে চাইলাম,
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পালিয়ে গেছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়েছে, কিন্তু সংসদ তখনো পুরোপুরি কার্যকর।
এই অবস্থায় আওয়ামী লীগের নিয়োগকৃত বা অনেকের চোখে স্বৈরাচারের নিয়োগকৃত বিতর্কিত একজন সাবেক রাষ্ট্রপতি হিসেবে আপনি নিজেকে কীভাবে প্রস্তুত করলেন?
বঙ্গভবনে উপস্থিত সবাই কি আপনাকে স্বৈরাচারের তকমা দিয়ে কটাক্ষ করেছিল, নাকি আপনার সহায়তা চেয়েছিল?
সাবেক রাষ্ট্রপতি হেসে বললেন — তখন তো আসলে আমি ছাড়া আর কোনো উপায় বা বিকল্প কারও কাছে খোলা ছিল না! আমাকে ছাড়া তো পুরো রাষ্ট্রকাঠামোই অচল।
বাস্তবতা হলো, প্রধানমন্ত্রী দেশ ছাড়ার পর সংসদ কার্যকর থাকলেও সরকার বলতে কিছু ছিল না। আইন ও সংবিধান অনুযায়ী, একমাত্র রাষ্ট্রপতিই পারেন সংসদ ভেঙে দিয়ে নতুন কোনো অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থার আইনি বৈধতা দিতে।
আমি ছাড়া রাষ্ট্রকে এই সংকট থেকে টেনে তোলার আর কোনো সাংবিধানিক রাস্তা ছিল না।
তাই বাইরে আমাকে নিয়ে যত বিতর্কই থাকুক না কেন, বঙ্গভবনের ভেতরে পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ উল্টো। সেখানে উপস্থিত রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ থেকে শুরু করে তিন বাহিনীর প্রধান বা ছাত্র প্রতিনিধি—কেউই আমাকে কোনো কটাক্ষ বা ‘স্বৈরাচারের তকমা’ দেয়ার মানসিকতায় ছিলেন না।
বরং, রাষ্ট্রকে এক মহাসংকট থেকে বাঁচাতে সবাই তখন অত্যন্ত উৎফুল্লভাবে আমার সহায়তা চাচ্ছিলেন। সবার চোখে-মুখে তখন একটাই অনুরোধ ছিল, যেন আমি আমার সাংবিধানিক ক্ষমতা ব্যবহার করে দ্রুত এই অচল রাষ্ট্রকাঠামোকে সচল করি। আমিও দেশের বৃহত্তর স্বার্থে নিজেকে শক্ত করে প্রস্তুত করেছিলাম।
বঙ্গভবনের সেই রুদ্ধদ্বার কক্ষে তখন ইতিহাসের চাকা ঘুরছিল তীব্র গতিতে। সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ঠিক কী ঘটেছিল সেই অজানা অধ্যায়ে, আজ তা অকপটে বলছি—
সন্ধ্যা নামার পরপরই বঙ্গভবনের দরবার হল এবং আমার সভাকক্ষ এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের সাক্ষী হলো। বিএনপির মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান, জাতীয় পার্টির গোলাম মোহাম্মদ কাদের, হেফাজতে ইসলামের নেতৃবৃন্দ এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের শীর্ষ নেতারা এসে পৌঁছালেন।
যে দলগুলো বছরের পর বছর একে অপরের মুখ দেখেনি, তারা সবাই আজ একই টেবিলে। সবার চোখে-মুখে এক মিশ্র অনুভূতি—শেখ হাসিনার পতনের স্বস্তি, আবার ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের অনিশ্চয়তার গভীর উদ্বেগ।
বৈঠকের শুরুতেই সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান সামগ্রিক পরিস্থিতি আমার সামনে তুলে ধরলেন।
তিনি স্পষ্ট করে বললেন, “মাননীয় রাষ্ট্রপতি,
শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন। দেশে এই মুহূর্তে কোনো সরকার নেই। রাস্তায় লাখ লাখ মানুষ।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যেকোনো মুহূর্তে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়তে পারে। আমাদের দ্রুত একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের রূপরেখা চূড়ান্ত করতে হবে। আমরা আপনার অকুণ্ঠ সমর্থন এবং সহায়তা কামনা করছি।”
তখন টেবিলে আলোচনা শুরু হলো—কে হবেন এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান? বিভিন্ন দল থেকে বিভিন্ন নাম আসছিল। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এক ধরনের মতপার্থক্য তৈরি হচ্ছিল, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছিল।
আমি রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দৃঢ় অবস্থান নিলাম। বললাম, “আমাদের এমন একজনকে বেছে নিতে হবে, যিনি দেশের এই সংকটকালে দল-মত নির্বিশেষে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য।"
ঠিক সেই সময়েই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের পক্ষ থেকে অত্যন্ত জোরালোভাবে শান্তিতে নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নাম প্রস্তাব করা হলো।
রাজনৈতিক দলগুলোর কয়েকজন প্রথমে কিছুটা ইতস্তত করলেও, আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে ছাত্রদের এই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে সম্মান না জানালে দেশ শান্ত হবে না।
আমি তাৎক্ষণিকভাবে ছাত্রদের সেই প্রস্তাবকে সমর্থন জানালাম। তিন বাহিনীর প্রধান এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দও ড. ইউনূসের নামে একমত হলেন। ফ্রান্স থেকে ড. ইউনূসের সাথে ফোনে যোগাযোগ করার প্রক্রিয়া তখনই শুরু করার নির্দেশ দিলাম।
সাবেক রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিন জানালেন,
রাত তখন বাড়ছে। ঘড়ির কাঁটা ১০টা, ১১টা পার হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আমাদের কাজ তখনো শেষ হয়নি। ড. ইউনূসকে প্রধান উপদেষ্টা করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের বিষয়ে সবাই একমত হওয়ার পর, রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে আমার কাঁধে এসে পড়ল চূড়ান্ত সাংবিধানিক দায়িত্ব।
দেশের সংসদ ভেঙে দেয়া এবং নতুন সরকার গঠনের আইনি ভিত্তি তৈরি করতে সুপ্রিম কোর্টের মতামত নেয়ার প্রক্রিয়া শুরু হলো।
একদিকে যখন বঙ্গভবনের লিগ্যাল টিম অধ্যাদেশের খসড়া তৈরি করছে, অন্যদিকে তখন তৈরি হচ্ছে জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া আমার সেই ঐতিহাসিক ভাষণের ড্রাফট।
রাত ১১টার পর আমি যখন টেলিভিশনের ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালাম, তখন আমার শরীরে দুপুরের সেই ক্লান্তির ছিটেফোঁটাও ছিল না। পুরো জাতি চাতক পাখির মতো চেয়েছিল বঙ্গভবনের দিকে।
আমি ঘোষণা করলাম—“প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন এবং আমি তা গ্রহণ করেছি।” সংসদ ভেঙে দেয়া হবে, খালেদা জিয়াসহ সমস্ত রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি দেওয়া হবে এবং ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে দ্রুত একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা হবে।
ভাষণ শেষ করে যখন আমি আমার কক্ষে ফিরে এলাম, ঘড়িতে তখন মধ্যরাত পার হয়ে গেছে। বঙ্গভবনের জানালা দিয়ে বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকালাম।
দুপুরের দিকে যে বঙ্গভবন ঘেরাও হওয়ার ভয়ে, নিজের জীবননাশের আশঙ্কায় আমি অস্থির ছিলাম—গভীর রাতে সেই বঙ্গভবন থেকেই আমি জাতিকে একটি নতুন পথ দেখালাম।
রাষ্ট্রকে এক মহা সাংবিধানিক সংকট থেকে রক্ষা করতে পারার যে মানসিক স্বস্তি, তা হয়তো আমার জীবনের সব ভয়কে এক নিমেষে মুছে দিয়েছিল।
আমি সাবেক রাষ্ট্রপতিকে প্রশ্ন করলাম, "এখন বলুন, আপনি তো বলছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গভবনে আসেননি। তিনি আপনার কাছে পদত্যাগপত্রও জমা দেননি। পরে কোনো কিছু না বলেই দেশ ছেড়ে ভারতে চলে গেলেন।
তাহলে ৫ আগস্ট রাতে জাতির উদ্দেশে ভাষণে আপনি কীভাবে বললেন যে, শেখ হাসিনা আপনার কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন?"
সাবেক রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন আমার দিকে কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। তাঁর চোখের কোণে তখন খেলা করছিল এক অদ্ভুত মিশ্র অনুভূতি। একটু সময় নিয়ে, সোজা হয়ে বসে তিনি অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে বলতে শুরু করলেন:
"আপনি তখনকার পরিস্থিতিটা কল্পনা করুন।"
"সেনাবাহিনী প্রধান টেলিভিশনে প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছেন, শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন।
এরপর রাজনৈতিক নেতারা যখন বঙ্গভবনে এলেন, তখন পদত্যাগের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু কেউ একবারের জন্যও জানতে চাননি, পদত্যাগপত্র আমার কাছে জমা হয়েছে কি না।"
আপনার প্রশ্নের উত্তরে আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই—আমি রাষ্ট্রকে এক সম্পূর্ণ অরাজকতা এবং গৃহযুদ্ধের হাত থেকে রক্ষা করতে এক বিশেষ 'সাংবিধানিক ক্রান্তিকালীন' সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছিলাম।
আপনারা আজ আইনি কাগজের খোঁজ করছেন। কিন্তু সেদিন দুপুরে যখন স্বয়ং দেশের সেনাবাহিনী প্রধান টেলিভিশন লাইভে এসে কোটি কোটি মানুষের সামনে ঘোষণা দিলেন যে প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন, তখন সেটিই ছিল দেশের জন্য সবচেয়ে বড় বাস্তব সত্য। শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার পর একটা প্রচণ্ড ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হয়েছিল।
রাত ১১টায় যখন আমি জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিই, তখন আমার সামনে প্রধান লক্ষ্য ছিল উত্তেজিত জনতাকে শান্ত করা এবং একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের আইনি পথ তৈরি করা।
আমি যদি সেদিন ভাষণে বলতাম, 'প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগপত্র দিয়ে যাননি, তাই তাঁর সরকার এখনো বৈধ'—তাহলে আপনি ভাবুন দেশের অবস্থা কী হতো? রাস্তায় লাখ লাখ ক্ষুব্ধ মানুষ তখন বঙ্গভবন গুঁড়িয়ে দিত।
সেনাবাহিনীকেও এক রক্তক্ষয়ী সংঘাতে জড়াতে হতো। দেশের বৃহত্তর স্বার্থে, শান্তি বজায় রাখার জন্য এবং নতুন সরকারের পথ সুগম করতেই আমাকে রাজনৈতিকভাবে সেই বক্তব্য দিতে হয়েছিল।
এটি কোনো আইনি ফাঁকি ছিল না, ছিল রাষ্ট্রকে বাঁচানোর এক সুকঠিন রাজনৈতিক কৌশল।
অনেকে বলেন, সংসদ তখনো কার্যকর ছিল, তাই রাষ্ট্রপতি এককভাবে তা ভাঙতে পারেন না। কিন্তু বাস্তবতা কী ছিল? সংসদের নেতা (প্রধানমন্ত্রী) দেশছাড়া, অধিকাংশ মন্ত্রী-এমপি আত্মগোপনে, এবং সংসদ ভবন সাধারণ মানুষের নিয়ন্ত্রণে। কার্যত সংসদ তখন একটি মৃত প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছিল।
৬ আগস্ট সকালে যখন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক এবং দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ আমার কাছে এসে অনতিবিলম্বে সংসদ ভেঙে দেয়ার আলটিমেটাম দিলেন, তখন আমার সামনে দুটি পথ ছিল।
এক, সংবিধানের যান্ত্রিক দোহাই দিয়ে সংসদ টিকিয়ে রাখা এবং দেশকে আরও বড় রক্তপাতের দিকে ঠেলে দেওয়া।
দুই, গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে সংসদ ভেঙে দিয়ে একটি নতুন শুরুর সুযোগ করে দেয়া। আমি দ্বিতীয় পথটি বেছে নিয়েছিলাম।
পরবর্তীতে আমরা সুপ্রিম কোর্টের ফুল কোর্ট রেফারেন্সের মাধ্যমে এই অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থার আইনি বৈধতা নিশ্চিত করেছিলাম।
এক পর্যায়ে সাবেক রাষ্ট্রপতি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে তিনি বললেন, আজ দুই বছর পর ঠান্ডা মাথায় বসে অনেকেই এটিকে সংবিধানের লঙ্ঘন বলতে পারেন।
কিন্তু সেদিন বঙ্গভবনের সেই চেয়ারে বসে আমি বুঝতে পেরেছিলাম—সংবিধান মানুষের জন্য, মানুষ সংবিধানের জন্য নয়।
আমি যদি সেদিন ওই কঠিন ও অপ্রচলিত সিদ্ধান্তগুলো না নিতাম, তবে রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ এক ভয়াবহ ও অপরিবর্তনীয় সাংবিধানিক এবং মানবিক সংকটে পতিত হতো।
ইতিহাস হয়তো আমার এই সিদ্ধান্তের চুলচেরা বিশ্লেষণ করবে, কিন্তু আমি জানি, আমি সেদিন রাষ্ট্রকে ভালোবেসে এই ঝুঁকি নিয়েছিলাম।"
আগামী পর্বে...
ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান উপদেষ্টা করা, কিভাবে উপদেষ্টা পরিষদ গঠন হলো এবং বঙ্গভবনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শপথের রুদ্ধদ্বার মুহূর্তের ভেতরের গল্প।