তানিয়া আক্তার ফারজানা
আজ ৫ আগস্ট, বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক ট্রাফিক লাইট দিবস (International Traffic Light Day)। সড়কে নিরাপদ ও শৃঙ্খলাপূর্ণ যান চলাচলে ট্রাফিক সিগন্যালের অপরিসীম গুরুত্ব তুলে ধরতে এবং বিশ্বের প্রথম বৈদ্যুতিক ট্রাফিক সিগন্যাল স্থাপনের স্মরণে প্রতিবছর এ দিবসটি পালন করা হয়।
ইতিহাস অনুযায়ী, ১৯১৪ সালের ৫ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও অঙ্গরাজ্যের ক্লিভল্যান্ড শহরের ইউক্লিড অ্যাভিনিউ ও ইস্ট ১০৫তম স্ট্রিটের মোড়ে বিশ্বের প্রথম বৈদ্যুতিক ট্রাফিক সিগন্যাল স্থাপন করা হয়। এটিকেই আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার সূচনা হিসেবে ধরা হয়। সেই সময় সিগন্যালটিতে মূলত লাল ও সবুজ আলো এবং প্রয়োজনে সতর্কবার্তা দেওয়ার জন্য একটি বৈদ্যুতিক ঘণ্টা ব্যবহৃত হতো। পরবর্তীতে এর সঙ্গে হলুদ আলো যুক্ত করা হয়, যা আজকের আধুনিক ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের ইতিহাস আরও পুরোনো। ১৮৬৮ সালে যুক্তরাজ্যের লন্ডনের পার্লামেন্ট ভবনের সামনে গ্যাসচালিত একটি যান্ত্রিক ট্রাফিক সংকেত বসানো হয়েছিল। যদিও প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে অল্প সময়ের মধ্যেই সেটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর ১৯১২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের উটাহ অঙ্গরাজ্যের সল্ট লেক সিটিতে এক পুলিশ কর্মকর্তা লাল ও সবুজ বাতিযুক্ত একটি কাঠের সংকেতব্যবস্থা চালু করেন। কিন্তু আধুনিক বৈদ্যুতিক ট্রাফিক সিগন্যালের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ১৯১৪ সালের ৫ আগস্ট থেকেই।
বর্তমানে ট্রাফিক লাইট শুধু মোটরযান নিয়ন্ত্রণেই নয়, পথচারী, সাইকেল আরোহী, গণপরিবহন এবং জরুরি সেবার যানবাহনের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। দ্রুত নগরায়ণ ও যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ট্রাফিক সিগন্যালের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল নতুন ট্রাফিক লাইট স্থাপন করলেই যানজট কমে না। সিগন্যাল গুলোর সঠিক সমন্বয়, নির্ধারিত সময় ব্যবস্থাপনা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং চালকদের ট্রাফিক আইন মেনে চলা এসব বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক পরিকল্পনার অভাবে অনেক শহরে ট্রাফিক সিগন্যাল থাকা সত্ত্বেও যানজট দীর্ঘস্থায়ী হয়।
বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে যানজটপূর্ণ শহরগুলোর মধ্যে রয়েছে ম্যানিলা, বোগোতা, লিমা, মস্কো, ইস্তাম্বুল ও জাকার্তা। এছাড়া ভারতের বেঙ্গালুরু, মুম্বাই, পুনে ও নয়াদিল্লি, এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক, লস অ্যাঞ্জেলেস, শিকাগো, বোস্টন, বাল্টিমোর ও আটলান্টা শহরও তীব্র যানজটের জন্য পরিচিত। প্রতি বছর এই দিবস উপলক্ষে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক সচেতনতামূলক কর্মসূচি, ট্রাফিক আইনবিষয়ক প্রচারণা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আলোচনা সভা, শিশু-কিশোরদের জন্য ট্রাফিক সচেতনতা কার্যক্রম এবং নিরাপদ সড়ক বিষয়ক প্রচারাভিযান আয়োজন করা হয়। অনেক দেশে ট্রাফিক পুলিশ ও সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ ট্রাফিক আইন মেনে চলার গুরুত্ব তুলে ধরে বিশেষ কর্মসূচি পালন করে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রাফিক লাইটের লাল, হলুদ ও সবুজ এই তিনটি রঙ শুধু যানবাহন নিয়ন্ত্রণের সংকেত নয়; এগুলো শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ এবং নিরাপদ সড়ক সংস্কৃতির প্রতীক। তাই নিরাপদ সড়ক গড়তে শুধু আধুনিক প্রযুক্তি নয়, প্রয়োজন নাগরিক সচেতনতা এবং ট্রাফিক আইন মেনে চলার মানসিকতা। আন্তর্জাতিক ট্রাফিক লাইট দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় একটি ছোট্ট সিগন্যালই প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের জীবন রক্ষা করে, দুর্ঘটনা কমায় এবং নগরজীবনের গতি সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল সড়ক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ট্রাফিক সিগন্যালের প্রতি সম্মান এবং ট্রাফিক আইন মেনে চলার বিকল্প নেই।
তানিয়া আক্তার ফারজানা