অনলাইন মঙ্গলবার, ০৪ আগস্ট ২০২৬
স্বাধীন ভারতবর্ষের প্রথম দিন লালকেল্লায় ইংরেজদের পতাকা নামিয়ে ভারতের জাতীয় পতাকা তোলা হচ্ছে তখন দিল্লি রেডিয়োয় মধুর কণ্ঠে ‘সোনে কা হিন্দুস্তান মেরা’, গানটি গাইছেন এক বাঙালি কন্যা, আবালবৃদ্ধ বনিতা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনছেন তাঁর গান, তিনি বিশিষ্ট সঙ্গীত শিল্পী যূথিকা রায়..
বাংলা গানের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন যূথিকা রায় তখন তিনি ১৪'র এক কিশোরী,প্রণব রায়ের কথায় ও কমল দাশগুপ্তর সুরে তাঁর রেকর্ড করা দুটি গান— ‘আমি ভোরের যূথিকা’ আর ‘সাঁঝের তারকা আমি’। ১৯৩৪-এর নভেম্বর মাসে প্রকাশ পাওয়ার তিন মাসের মধ্যে ৬০,০০০ কপি বিক্রি হয়ে যায়।
পিতার সঙ্গে কন্যা দিল্লি স্টেশনে সকালবেলা রেকর্ডিং শেষ করে সবে বাইরে এসেছেন, অফিসরুম থেকে একটা অফিসার ছুটতে ছুটতে এসে হন্তদন্ত হয়ে বাবাকে বললেন, ‘যাবেন না, যাবেন না, দাঁড়ান আমাদের বিশেষ কথা আছে। ‘এইমাত্র আমি ত্রিমূর্তি হাউস থেকে ফোন পেয়েছি। আমাকে ফোন দিয়েছে পন্ডিত জওহরলাল নেহেরুর তরফ থেকে – তিনি জানিয়েছেন যে, আমাদের প্রসেশন এখন লালকেল্লায় যাচ্ছে, ওখানে ভাষণ দেওয়া হবে এবং ব্রিটিশ পতাকা নামিয়ে আমাদের জাতীয় পতাকা তোলা হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত যেন যূথিকা গান গেয়ে যায়। যূথিকা বলেছেন— আমি তো ঢুকে পড়লুম – আমার মনে পড়লো একটা স্বাধীনতার গান – ‘সোনে কা হিন্দুস্তান মেরা – সোনে কা হিন্দুস্তান মেরা’, এটা দিয়েই আমি আরম্ভ করেছিলাম। তারপর ওখান থেকে সংকেত পেলাম যে – ‘বন্ধ করো’। বন্ধ করে আমি বেরিয়ে এলাম। তা সেটা আমার সঙ্গীত জীবনের একটা খুব বড়ো স্মৃতি'৷
গ্রামোফোন কোম্পানির উদ্যোগেই শিল্পীর গান রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কে শোনানো হয়েছিল'ভোরের যূথিকা’র রেকর্ড, মুগ্ধ হয়ে কবি বলেছিলেন, ‘এই মেয়েটির গানে যেন চিরকাল এই রকমই পরিমিত বাজনা ব্যবহার করা হয়'৷ কবি কাজী নজরুল স্বয়ং তাঁর গান শুনে মুগ্ধ হয়েছেন,তাঁকে দিয়ে নিজের দু’টো গান গ্রামোফোন কোম্পানিতে রেকর্ড করিয়েছিলেন। কিন্তু বিপত্তি তৈরি হল কোম্পানির বোর্ডে পাশ হল না সেই রেকর্ড৷ এই ঘটনায় কবি কাজী নজরুল ভীষণ ক্ষুব্ধ হলেও তখনকার মত মেনে নিয়েছিলেন বিষয়টা৷
কমল দাশগুপ্ত আবার কোম্পানির বাতিল রেকর্ডের স্তূপ ঘেঁটে পেয়েছিলেন কাঙ্খিত কণ্ঠ, রেকর্ড করালেন সেই বাতিল শিল্পীকে দিয়েই,কিন্তু এবারও রেকর্ডটি নিতে ডিলাররা অস্বীকার করে ফেলেছেন একপ্রকার৷ ওদিকে শিল্পীর কণ্ঠ অনেকদিন আগেই জয় করেছে কাজী নজরুল ইসলামের হৃদয় ,তাঁকে রুখবে সাধ্যি কার! নজরুল এবার ডিলারদের প্রতি বেশ কড়া হলেন, পরিস্কার বললেন ওই শিল্পীর রেকর্ডটা না নিলে ডিলারদের কোনও রেকর্ডই দেওয়া হবে না।সমস্যার সমাধান হতে আর বিলম্ব হওয়ার কথা নয়,হল না৷
কমল দাশগুপ্ত যূথিকাকে বলেছিলেন সহজ কথায় সুরে মেলডিতে ভরা রোম্যান্টিক বাংলা গান তারা চাইছেন৷ শিল্পীর মত কণ্ঠ তাদের পছন্দ,যে শিল্পীর সঙ্গীতের শিক্ষায় শাস্ত্রীয়-সঙ্গীতের ছোঁয়া আছে, কিন্তু প্রকট নয়৷ তাদের উদ্দেশ্য গান জনপ্রিয় হতে হবে,হৃদয় স্পর্শ করতে হবে তামাম বাঙালির, শুধুমাত্র এলিট ক্লাসের জন্য রেকর্ড তৈরি হবে না৷ এই ঘটনা ১৯৩৪ সালের,শিল্পী গ্রামোফোন কোম্পানিতে এসেছিলেন গান রেকর্ড করতে। ঘরে তখন সুরকার কমল দাশগুপ্ত ও গীতিকার প্রণব রায়। রাতারাতি জনপ্রিয় হয়ে গিয়েছিলেন কিশোরী শিল্পী। প্রণব রায়ের কথায় ও কমল দাশগুপ্তর সুরে রেকর্ড করা দুটি গান— ‘আমি ভোরের যূথিকা’ আর ‘সাঁঝের তারকা আমি’। ১৯৩৪-এর নভেম্বর মাসে প্রকাশ পাওয়ার তিন মাসের মধ্যে ৬০,০০০ কপি বিক্রি হয়ে গেলো সেই রেকর্ড।
বাংলা গানের মোড় ঘুরিয়ে দিলেন বছর ১৪'র এক কিশোরী৷ তিনি কিংবদন্তি সঙ্গীত শিল্পী যূথিকা রায়..
বাবার ইচ্ছা মেয়ে বড় সঙ্গীত শিল্পী হোক,সেইজন্য চেষ্টার খামতি ছিল না৷ সাত বছরের মেয়ে বাবার সঙ্গে কলকাতায় এলেন৷ ওইটুকু মেয়েকে বিমল দাশগুপ্ত প্রথমে গান শেখাতে রাজি হন নি৷তবে প্রতিভা তাঁর জন্মগত৷তখন কলকাতা বেতারের সদ্য জন্ম হয়েছে৷সেখানে অডিশনে পাশ করে খালি গলায় যূথিকা গাইলেন রবীন্দ্রনাথের গান 'আর রেখো না আঁধারে'৷ বাংলা গান দিয়ে সঙ্গীত জীবন শুরু হলেও পরে ভারতের নানা ভাষায় গান গেয়েছেন৷ আধুনিক বাংলা গান থেকে অতুলপ্রসাদ-নজরুলগীতি, ভক্তিগীতি, কীর্তন, সিনেমার গান সর্বত্র তিনি বিচরণ করতেন সাবলীল ভাবে স্বাচ্ছন্দে৷ মীরার ভজন যখন গাইতেন শ্রোতারা মুগ্ধ হয়ে শুনতেন৷ অনেকদিন রেকর্ড-লেবেলে তাঁর আসল নামের সঙ্গে ‘রেণু’ ডাকনামটিও লেখা থাকত, পরে শুধু যূথিকা রায়৷
তিনি বিকশিত,পরিনত হয়েছেন কমল দাশগুপ্তের সঙ্গীত-স্পর্শে পরে অবশ্যই নিজের প্রতিভার জোরে হয়ে গেলেন কিংবদন্তি৷ হাতে গোনা দু'চারটি রেকর্ড বাদ দিলে কিংবদন্তি যূথিকা রায় যত গান সারাজীবন রেকর্ডে গেয়েছেন,তার সঙ্গীত পরিচালক শুধুমাত্র কমল দাশগুপ্ত৷ তাদের যুগলবন্দিতে আধুনিক বাংলা গানের বেশ কতগুলি উদাহরন দিলে বোঝা যাবে কেমন অসাধারন ছিল কমল-যূথিকার মেলবন্ধন৷ নজরুলের কথায় ‘মনে পড়ে আজ সে কোন জনমে’ ‘ওরে নীল যমুনার জল’, অথবা প্রণব রায়ের কথায় ‘এমনই বরষা ছিল সে দিন’ বাঙালির হৃদয়ে চিরদিনের জন্য স্থান পেয়েছে..
| #এক_যে_ছিলো_নেতা |
মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার কোন দায় ডিজিটাল কতৃপক্ষ দায়ী নন।
নিউজ ডেস্ক