তানিয়া আক্তার ফারজানা
বিশ্বজুড়ে ঘর সাজানো, রান্না, বাগান পরিচর্যা ও আধুনিক জীবনযাপনের প্রতীক হিসেবে যে কয়েকটি নাম সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয়, তাদের মধ্যে অন্যতম মার্থা স্টুয়ার্ট। একজন সাধারণ গৃহিণী থেকে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন উদ্যোক্তা, লেখক ও টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠার তার গল্প আজও লাখো মানুষের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস। ১৯৪১ সালের ৩ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির জার্সি সিটিতে জন্মগ্রহণ করেন মার্থা হেলেন কস্টিরা। পোলিশ বংশোদ্ভূত একটি পরিবারে বেড়ে ওঠা মার্থা ছোটবেলা থেকেই রান্না, বাগান করা, সেলাই, ঘর সাজানো ও অতিথি আপ্যায়নের মতো গৃহস্থালির নানা কাজ শেখেন। পরবর্তীতে এসব সাধারণ দক্ষতাই তাকে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি এনে দেয়।
শিক্ষাজীবন শেষে তিনি কিছুদিন মডেল হিসেবে কাজ করেন। পরে ওয়াল স্ট্রিটে স্টকব্রোকার হিসেবেও কর্মজীবন শুরু করেন। তবে চাকরির গণ্ডিতে নিজেকে সীমাবদ্ধ না রেখে ১৯৭৬ সালে একটি ছোট ক্যাটারিং ব্যবসা শুরু করেন। তার খাবারের মান, পরিবেশনের সৌন্দর্য ও আয়োজনের অভিনবত্ব দ্রুতই মানুষের নজর কাড়ে। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয় ক্যাটারিং উদ্যোক্তাদের একজন হয়ে ওঠেন।
১৯৮২ সালে প্রকাশিত তার প্রথম বই "Entertaining" ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। এরপর একে একে প্রকাশ করেন অসংখ্য বেস্টসেলার বই। পাশাপাশি Martha Stewart Living নামে একটি জনপ্রিয় ম্যাগাজিন এবং একই নামে টেলিভিশন অনুষ্ঠান চালু করেন। রান্না, ঘর সাজানো, বাগান পরিচর্যা, উৎসবের আয়োজন ও জীবনযাপনের নানা পরামর্শের মাধ্যমে তিনি কোটি কোটি দর্শকের আস্থা অর্জন করেন। শুধু লেখালেখি বা টেলিভিশনেই নয়, নিজের প্রতিষ্ঠিত Martha Stewart Living Omnimedia-এর মাধ্যমে তিনি গড়ে তোলেন একটি আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য। প্রকাশনা, টেলিভিশন, গৃহস্থালি পণ্য, আসবাবপত্র, রান্নার সরঞ্জাম, অনলাইন বাণিজ্য এবং জীবনযাপন বিষয়ক নানা পণ্য নিয়ে তার প্রতিষ্ঠান বিশ্বজুড়ে ব্যবসা পরিচালনা করে।
তবে জীবনের পথ সবসময় মসৃণ ছিল না। ২০০৪ সালে শেয়ারবাজার–সংক্রান্ত একটি মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়ে তাকে পাঁচ মাস কারাদণ্ড এবং পাঁচ মাস গৃহবন্দি থাকতে হয়। তখন অনেকেই ধারণা করেছিলেন, তার ক্যারিয়ারের সমাপ্তি ঘটেছে। কিন্তু মার্থা স্টুয়ার্ট হার মানেননি। কারামুক্ত হওয়ার পর নতুন উদ্যমে কাজে ফিরে আসেন এবং ধীরে ধীরে আবারও নিজের প্রতিষ্ঠানকে সফলতার শিখরে নিয়ে যান। তার এই প্রত্যাবর্তন ব্যবসায়িক জগতে অন্যতম সফল 'কামব্যাক' হিসেবে বিবেচিত হয়। বয়সকে কখনোই বাধা হতে দেননি তিনি। ২০২৩ সালে ৮১ বছর বয়সে Sports Illustrated Swimsuit Issue-এর প্রচ্ছদে স্থান পেয়ে ইতিহাসের সবচেয়ে বয়স্ক নারী হিসেবে নতুন রেকর্ড গড়েন। ২০২৪ সালে তার জীবন, সংগ্রাম ও সাফল্য নিয়ে নির্মিত "Martha" নামের একটি তথ্যচিত্র নেটফ্লিক্সে মুক্তি পায়, যা দর্শকদের ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মার্থা স্টুয়ার্টের জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো সাধারণ দক্ষতা, কঠোর পরিশ্রম, সৃজনশীলতা এবং উদ্যোক্তা মানসিকতা থাকলে যেকোনো মানুষ বিশ্বমানের সফলতা অর্জন করতে পারেন। সংকট, সমালোচনা কিংবা ব্যর্থতা তাকে থামাতে পারেনি; বরং প্রতিটি বাধাকে তিনি নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তিতে পরিণত করেছেন। মার্থা স্টুয়ার্ট আজ শুধু একজন সফল ব্যবসায়ী নন, তিনি অধ্যবসায়, আত্মবিশ্বাস ও সৃজনশীলতার এক উজ্জ্বল প্রতীক, যার জীবনগাথা নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তাদের জন্য এক অনন্য অনুপ্রেরণা।
তানিয়া আক্তার ফারজানা