রবিবার, ০২ আগস্ট ২০২৬
হোম অপরাধ অর্থনীতি আইন-আদালত আন্তর্জাতিক খেলাধুলা গণমাধ্যম জাতীয় বিজ্ঞান-প্রযুক্তি বিনোদন রাজনীতি শিক্ষা সারাবাংলা

‘আমি কোনো দিন সিনেমা করব না’-সেই মেয়েই হলেন কিংবদন্তি ববিতা

তানিয়া আক্তার ফারজানা তানিয়া আক্তার ফারজানা
রবিবার, ০২ আগস্ট ২০২৬, ১২:৪০ pm
‘আমি কোনো দিন সিনেমা করব না’-সেই মেয়েই হলেন কিংবদন্তি ববিতা

তানিয়া আক্তার ফারজানা

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে উজ্জ্বল এক নাম ববিতা। কিন্তু অবাক করার মতো বিষয় হলো, ছোটবেলায় অভিনয়ের প্রতি তাঁর কোনো আগ্রহই ছিল না। বরং বড় বোন সুচন্দাকে শুটিংয়ে কষ্ট করতে দেখে তিনি মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন জীবনে কখনো সিনেমায় অভিনয় করবেন না। অথচ সময়ের পরিক্রমায় সেই মেয়েটিই হয়ে ওঠেন দেশের চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় ও সফল নায়িকা।

ববিতা জানান, তাঁর বাবা এ এস এম নিজামুদ্দীন আতাইয়ুব ছিলেন একজন সরকারি কর্মকর্তা। আর মা জাহানারা সন্তানদের শুধু লেখাপড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং গান, নাচ, আবৃত্তি ও সংস্কৃতিচর্চায় উৎসাহ দিতেন। মায়ের বিশ্বাস ছিল, একজন মানুষের শিক্ষা শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না সাংস্কৃতিক চর্চাও ব্যক্তিত্ব গঠনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে অভিনয়ে আসার পেছনে ছিল একেবারেই ভিন্ন গল্প। বড় বোন সুচন্দার শুটিং দেখে ছোট্ট ববিতা ভাবতেন, সিনেমায় অভিনয় করা খুবই কষ্টের কাজ। পরিচালক বারবার শট নিচ্ছেন, খালি পায়ে দৌড়াতে হচ্ছে, পাহাড়ে উঠতে হচ্ছে এসব দেখে তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তাঁকে কেউ সিনেমায় ডাকলেও তিনি রাজি হবেন না।

কিন্তু ভাগ্যের লিখন ছিল অন্যরকম। কিংবদন্তি চলচ্চিত্র নির্মাতা জহির রায়হানের অনুরোধে প্রথমবার ক্যামেরার সামনে দাঁড়ান তিনি। প্রথমে ‘সংসার’ ছবিতে অভিনয় করেন, তখন তাঁর নাম ছিল ‘সুবর্ণা’। পরে উর্দু ছবি জ্বলতে সুরাজ কে নিচে এর সময় তাঁর নতুন নাম রাখা হয় ‘ববিতা’। সেই নামেই পরবর্তীতে তিনি হয়ে ওঠেন দেশের কোটি দর্শকের প্রিয় মুখ। বাংলা চলচ্চিত্রে নায়িকা হিসেবে তাঁর যাত্রা শুরু হয় ‘শেষ পর্যন্ত’ ছবির মাধ্যমে। নায়ক ছিলেন কিংবদন্তি অভিনেতা রাজ্জাক। প্রথম রোমান্টিক দৃশ্যের স্মৃতি স্মরণ করে ববিতা বলেন, রাজ্জাককে তিনি আগে ‘বাবা’ বলে সম্বোধন করেছিলেন। পরে যখন তাঁকে প্রেমের দৃশ্যে অভিনয় করতে বলা হয়, তখন তিনি ভীষণ অস্বস্তিতে পড়ে যান। তবে ধীরে ধীরে অভিনয়কে আপন করে নেন এবং রাজ্জাকের সঙ্গে গড়ে ওঠে বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় জুটি।

অভিনয়জীবনের শুরুতেই আসে ব্যক্তিগত জীবনের এক গভীর বেদনাময় মুহূর্ত। প্রথম ছবির পারিশ্রমিকের ১২ হাজার টাকা দিয়ে একটি টয়োটা গাড়ি কিনেছিলেন তিনি। সেই গাড়ি দেখানোর জন্য হাসপাতালে অসুস্থ মায়ের কাছে ছুটে যান। কিন্তু সেখানে পৌঁছে জানতে পারেন, তাঁর মা আর বেঁচে নেই। জীবনের সেই দিনটিকে আজও সবচেয়ে কষ্টের স্মৃতি হিসেবে মনে করেন ববিতা।

দেশীয় চলচ্চিত্রে সাফল্যের পর আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকেও ডাক পান তিনি। বিশ্বখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা সত্যজিৎ রায় তাঁর অশনি সংকেত ছবির জন্য ববিতাকে নির্বাচন করেন। প্রথমে কলকাতা থেকে চিঠি এলেও তিনি বিশ্বাস করতে পারেননি। পরে ভারতীয় হাইকমিশন থেকে যোগাযোগ করা হলে কলকাতায় যান। সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতের স্মৃতিচারণ করে ববিতা বলেন, প্রথম দিন তিনি বেশ সাজগোজ করে গিয়েছিলেন। তখন সত্যজিৎ রায় হেসে বলেছিলেন, “তুমি এত সেজেগুজে এসেছ কেন?” পরদিন কোনো মেকআপ ছাড়া যেতে বললে তিনি সেভাবেই যান। তাঁকে দেখে পরিচালক বলেন, “আজকেই তো তোমাকে বেশি সুন্দর লাগছে।” অডিশন শেষে সত্যজিৎ রায়ের বিখ্যাত মন্তব্য ছিল, “ইউরেকা! আমি পেয়ে গেছি, আমার অনঙ্গ বউকে পেয়ে গেছি।”

শুটিংয়ের আগে সত্যজিৎ রায় নিয়মিত তাঁকে চিঠি লিখতেন। একবার ববিতা মজা করে লিখেছিলেন, মোটা হওয়ার জন্য তিনি পান্তাভাত খাচ্ছেন। জবাবে সত্যজিৎ রায় লিখেছিলেন, “খবরদার, তুই এটা করিস না। তুই যেমন আছিস, তেমনই খুব সুন্দর আছিস।” বাংলাদেশের নির্মাতাদের মধ্যে আমজাদ হোসেনের প্রতি বিশেষ শ্রদ্ধার কথা জানান ববিতা। তাঁর ভাষায়, গ্রামবাংলার গল্পকে এত সুন্দরভাবে খুব কম পরিচালকই পর্দায় তুলে ধরতে পেরেছেন। ‘নয়নমণি’, ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’, ‘কসাই’ ও ‘সুন্দরী’সহ বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রের স্মৃতিও তুলে ধরেন তিনি।

দীর্ঘ অভিনয়জীবনে প্রায় ২৭৫টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন ববিতা। কয়েকটি সিনেমা প্রযোজনাও করেছেন। যদিও এখন আর নিয়মিত অভিনয় করেন না, তবুও ভালো গল্প ও শক্তিশালী চরিত্র পেলে আবারও ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতে চান। তাঁর ভাষায়, “একজন শিল্পীর শেষ বলে কোনো কথা নেই।” সাক্ষাৎকারের শেষ মুহূর্তে দর্শকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ববিতা বলেন, “আমি ববিতা হয়েছি আমার প্রিয় দর্শকদের জন্য। তাঁদের ভালোবাসাই আমাকে আজকের এই অবস্থানে নিয়ে এসেছে।” একসময় যে কিশোরী দৃঢ় কণ্ঠে বলেছিলেন, “আমি কোনো দিন সিনেমা করব না,” সময়ের পরিক্রমায় তিনিই হয়ে উঠেছেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসের অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাঁর জীবনগল্প নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য যেমন অনুপ্রেরণা, তেমনি বাংলা চলচ্চিত্রের গৌরবময় ইতিহাসেরও এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়।

Viewer Image
×
লিংক কপি করা হয়েছে!