শিবচর প্রতিনিধি (মাদারীপুর):
হাতুড়ি-বাটালের ঠকঠক শব্দে এখন মুখর মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার সুতারবাড়ি গ্রাম। বর্ষা মৌসুম শুরু হতেই দম ফেলার ফুসরত নেই এখানকার নৌকা নির্মাণ কারিগরদের। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলছে ডিঙ্গি, কোষাসহ নানা ধরনের নৌকা তৈরির কাজ।
একসময়কার অপরিহার্য এই বাহনটির কদর আগের মতো না থাকলেও, বর্ষা এলেই কিছুটা প্রাণ ফিরে পায় গ্রামবাংলার এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প।
নৌকা মানেই বর্ষা, আর বর্ষা মানেই যেন বাঙালির চিরচেনা এক আবেগ। নদীমাতৃক বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় একসময় মানুষের প্রধান বাহনই ছিল নৌকা। বর্ষাকালে চারদিকে পানি থইথই করলে ডিঙ্গি বা কোষা নৌকা ছাড়া এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে যাওয়ার তেমন কোনো উপায় থাকত না।
হাট-বাজারে যাওয়া, স্কুল-কলেজে যাতায়াত কিংবা চিকিৎসার জন্য দূর-দূরান্তে পাড়ি জমাতে চরাঞ্চল ও নদীবেষ্টিত এলাকার মানুষের একমাত্র ভরসা ছিল এই জলযান। মানুষের জীবন-জীবিকা, শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল নৌকা।
সরেজমিনে সুতারবাড়ি গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, কাঠ আর পেরেক নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন কারিগররা। তারা জানান, একটি ডিঙ্গি নৌকা তৈরি করতে সাধারণত তিন থেকে চার দিন সময় লাগে। নৌকা তৈরিতে মূলত চাম্বল, আম ও কড়ই কাঠ ব্যবহার করা হয়। এর পাশাপাশি পেরেক, তারকাটাসহ অন্যান্য উপকরণেরও প্রয়োজন হয়।
তবে বর্তমানে এই শিল্পের সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে উপকরণের ঊর্ধ্বমুখী দাম। নির্মাণসামগ্রীর দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। একটি ডিঙ্গি নৌকা তৈরি করতে এখন প্রায় ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা খরচ হয়, যা বাজারে বিক্রি হয় ৭ থেকে ৮ হাজার টাকায়। তৈরি করা এসব নৌকা স্থানীয় মাদবরেরচর হাট ও উতরাইল হাটে বিক্রি করা হয়। এছাড়া অনেক ক্রেতা সরাসরি কারিগরদের বাড়িতে এসেও নৌকা কিনে নিয়ে যান।
আধুনিক যোগাযোগের বিস্তার এবং প্রকৃতির বিরূপ প্রভাবে এই শিল্প আজ অনেকটা সংকটাপন্ন। নদী-নালা, খাল-বিল ভরাট হয়ে যাওয়ায় আগের মতো নৌকার আর প্রয়োজন হয় না। আক্ষেপের সুরে এক কারিগর বলেন, জন্মের পর থেকেই নৌকার কাজ করি, জীবনে অন্য কোনো কাজ শিখিনি। এই কাজের ওপরই আমাদের সংসার চলে। সারা বছর তেমন বিক্রি না হলেও বর্ষা মৌসুমে নৌকার চাহিদা কিছুটা বাড়ে।
বাপ-দাদার এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প টিকিয়ে রাখতে সরকারি সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতার দাবি জানিয়েছেন কারিগররা। তাদের মতে, প্রয়োজনীয় সহায়তা ও প্রণোদনা পেলে নৌকা নির্মাণ শিল্প আবারও ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হবে।
এ বিষয়ে শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এইচ. এম. ইবনে মিজান আশার কথা শুনিয়েছেন। তিনি বলেন, শিবচরের নৌকা কারিগরদের টিকিয়ে রাখা এবং তাদের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য সরকারি ক্ষুদ্র ঋণসহ বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতার বিষয় বিবেচনা করা হবে। এতে কারিগররা আরও উৎসাহিত হবেন এবং গ্রামবাংলার এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন।
মোঃ শামীম আহমেদ