তানিয়া আক্তার ফারজানা
আজ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপিত হচ্ছে ফ্রেন্ডশিপ ডে (Friendship Day)। বন্ধুত্ব, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আস্থা ও মানবিক সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করার প্রত্যয়ে দিনটি নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে পালন করা হচ্ছে। যদিও আন্তর্জাতিকভাবে ৩০ জুলাই জাতিসংঘ ঘোষিত আন্তর্জাতিক বন্ধুত্ব দিবস (International Day of Friendship) পালিত হয়, তবু ভারত, বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশে আগস্ট মাসের প্রথম রোববার ফ্রেন্ডশিপ ডে উদযাপনের দীর্ঘদিনের প্রচলন রয়েছে।
ইতিহাস বলছে, বিশ্ব বন্ধুত্ব দিবসের ধারণাটি প্রথম দেন আরতেমিও ব্রাচো। ১৯৫৮ সালের ২০ জুলাই প্যারাগুয়ের পুয়ের্তো পিনাসকো শহরে বন্ধুদের সঙ্গে এক নৈশভোজে তিনি বিশ্বজুড়ে বন্ধুত্ব উদযাপনের প্রস্তাব দেন। সেই ভাবনা থেকেই ধীরে ধীরে দিবসটি আন্তর্জাতিক পরিচিতি লাভ করে। পরবর্তীতে ২০১১ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ৩০ জুলাইকে আন্তর্জাতিক বন্ধুত্ব দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। জাতিসংঘের মতে, ব্যক্তি, সমাজ, সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রের মধ্যে বন্ধুত্ব এবং পারস্পরিক বিশ্বাস বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। বিভিন্ন জাতি, ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে উঠলে বিভেদ কমে, সংলাপ বাড়ে এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পথ সুগম হয়।
দিবসটি উপলক্ষে দেওয়া বার্তায় জাতিসংঘ বলেছে, বর্তমান বিশ্বে যুদ্ধ, সংঘাত, বৈষম্য, ঘৃণা ও ভয়ের মতো নানা সংকটের মধ্যেও বন্ধুত্ব মানুষের মধ্যে আশা ও সম্প্রীতির সেতুবন্ধন তৈরি করতে পারে। প্রকৃত শান্তি শুধু আন্তর্জাতিক চুক্তি বা কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে নয়, বরং মানুষের দৈনন্দিন জীবনে পারস্পরিক বিশ্বাস, সহমর্মিতা ও সম্মান গড়ে তোলার মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠিত হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, তরুণদের মধ্যে আন্তরিক বন্ধুত্ব সামাজিক সম্প্রীতি ও সহনশীলতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বন্ধুত্ব ভাষা, ধর্ম, জাতিগত পরিচয় কিংবা ভৌগোলিক সীমারেখার পার্থক্য অতিক্রম করে মানুষকে একে অপরের কাছাকাছি নিয়ে আসে। এর মাধ্যমে বৈচিত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ তৈরি হয় এবং সমাজে পারস্পরিক বোঝাপড়া আরও শক্তিশালী হয়।
এ উপলক্ষে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন ও স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান নানা কর্মসূচির আয়োজন করেছে। বন্ধুদের শুভেচ্ছা বিনিময়, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আলোচনা সভা, রক্তদান কর্মসূচি, বৃক্ষরোপণ এবং সামাজিক সেবামূলক কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে দিনটি উদযাপন করা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও শুভেচ্ছা বার্তা, ছবি ও ভিডিও শেয়ার করে বন্ধুত্বের বন্ধনকে উদযাপন করছেন কোটি কোটি মানুষ।
জাতিসংঘের এই উদ্যোগটি ইউনেস্কোর "সংস্কৃতির শান্তি (Culture of Peace)" ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এর লক্ষ্য হলো সহিংসতা পরিহার, সংঘাতের মূল কারণ দূর করা এবং শিক্ষা, মানবাধিকার, সমতা, সহনশীলতা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে একটি শান্তিপূর্ণ বিশ্ব গড়ে তোলা। এ লক্ষ্যে জাতিসংঘ শিক্ষার মাধ্যমে শান্তির সংস্কৃতি গড়ে তোলা, টেকসই অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা, মানবাধিকারের প্রতি সম্মান বৃদ্ধি, নারী-পুরুষের সমতা প্রতিষ্ঠা, গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ উৎসাহিত করা, পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সংহতি বাড়ানো, তথ্য ও জ্ঞানের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা জোরদারের আহ্বান জানিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রযুক্তিনির্ভর এই সময়ে মানুষের মধ্যে যোগাযোগ বেড়েছে, কিন্তু আন্তরিক সম্পর্কের গুরুত্বও সমানভাবে বেড়েছে। তাই বন্ধুত্ব শুধু ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিষয় নয়, এটি একটি শান্তিপূর্ণ, সহনশীল ও মানবিক সমাজ গঠনের অন্যতম শক্তিশালী ভিত্তি। সেই বার্তাই বহন করছে এ বছরের ফ্রেন্ডশিপ ডে উদযাপন।
তানিয়া আক্তার ফারজানা