উত্তরের বৃহৎ জেলা নওগাঁ ইতিহাস ও ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ। ধান ও সবজির পাশাপাশি জেলায় নতুন করে আম যুক্ত হয়েছে। এটি একটি বৃহৎ ও কৃষিনির্ভর অঞ্চল। ভৌগলিক দিক দিয়ে এ জেলাটি দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত। যা ভারত সীমান্ত ঘেষা। এ জেলা ১১টি উপজেলা ও তিনটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত। যেখানে জনসংখ্যা প্রায় ৩০ লাখ।উত্তরাঞ্চলের ৮টি জেলা নিয়ে রাজশাহী বিভাগ। এ বিভাগের সাথে নওগাঁ জেলা যুক্ত রয়েছে। তবে সম্প্রতি বগুড়া বিভাগ চালু হওয়ার গুঞ্জন উঠেছে। যেখানে-বগুড়া, নওগাঁ, জয়পুরহাট, সিরাজগঞ্জ ও গাইবান্ধা জেলা নিয়ে বিভাগ হওয়া সম্ভবনা রয়েছে। তবে নওগাঁবাসী বগুড়া বিভাগের সাথে যুক্ত হতে চায়না। যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ, শিক্ষা নগরী, সবুজ ও পরিচ্ছন্ন শহর হওয়ায় রাজশাহী বিভাগের সাথে থাকতে চান এ জেলাবাসী।ধানকে কেন্দ্র করে জেলাতে এক সময় প্রায় এক হাজারের অধিক চালকল গড়ে উঠেছিল।
চালকল ছাড়া এ জেলায় তেমন কোন কলকারখানা গড়ে উঠেনি। তবে এক দশকে জেলায় তৃতীয় ফসল আম বাগান গড়ে উঠেছে। যা থেকে বছরে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা অধিক জেলায় অর্থনীতিতে অবদান রাখছে। এমনকি দেশের গন্ডি পেরিয়ে এ জেলার আম বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে।স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে যোগাযোগ ব্যবস্থার কিছুটা উন্নয়ন হলেও ব্যবসা-বাণিজ্য, কলকারখানা ও ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে না উঠায় সবদিক থেকে এ জেলাটি পিছিয়ে রয়েছে। এ কারণে জীবন-জীবিকার তাগিদে মানুষ এখনও ঢাকামুখী। জেলার উন্নয়ন না হওয়াকে অনেকটা বিগত জনপ্রতিনিধিদের দোষারোপ করছেন সচেতনরা।
বিগত জনপ্রতিনিধিরা শুধু নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত থাকায় জেলার উন্নয়নের কথা ভুলে গেছেন। এজেলায় বিগত সরকারের সময় খাদ্যমন্ত্রী, পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী এবং ডেপুটি স্পীকার সহ সরকারে গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন জনপ্রতিনিধিরা।বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের জেলা সমন্বয়ক ফজলে রাব্বী বলেন- এ জেলা থেকে বিগত সময়ে সরকারে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বড় বড় পদে অনেকেই ছিলেন। রাজনীতিবিদদের সদিচ্ছা ও তাদের ব্যর্থতার কারণে নওগাঁর উন্নয়ন হয়নি। মোটকথা- তারা জেলার উন্নয়ন চাননি বলেই হয়ত উন্নয়ন হয়নি। ভৌগলিক কারণে বিভিন্ন দিক থেকে জেলাটি উন্নয়নে পিছিয়ে রয়েছে। রাজনীতিবিদরা নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত ছিলেন। জেলাটি বগুড়ার সাথে যুক্ত হলেই যে উন্নয়ন হবে এমনটা না।আর এ জেলার ৯০ শতাংশ মানুষই রাজশাহী সাথে যুক্ত।
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) নওগাঁ জেলা সমন্বয়ক জয়নাল আবেদীন মুকুল বলেন, নওগাঁ জেলা ইতিহাস ঐতিহ্যগত ভাবে সমৃদ্ধ। জেলাটি এক সময় মহকুমা ছিলো, যা রাজশাহী জেলার অন্তর্ভুক্ত ছিলো। তারপর এটি জেলা হলো এবং রাজশাহী বিভাগের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। বিভাগীয় শহরে মানুষের খুব একটা কাজ থাকে না। নতুন করে বিভাগ তৈরির পক্ষে আমি না। নতুন করে বিভাগ তৈরি হলে রাষ্ট্রের খরচ বাড়বে। এতে রাজস্ব ব্যয় বাড়বে। জনগণের ওপর করের বোঝা বাড়বে।যা জনগনের জন্য ক্ষতি।
নওগাঁ জেলা এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও নাগরিক অধিকার পরিষদের সদস্য দেওয়ান মাহবুব সোহাগ বলেন, “নওগাঁকে বগুড়া বিভাগের সঙ্গে যুক্ত করা হলে জেলার অধিকাংশ উপজেলার মানুষের যাতায়াত ও প্রশাসনিক সেবা গ্রহণে জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই বিভাগ পুনর্গঠনের প্রয়োজন হলে শুধু নওগাঁকে বগুড়ার সঙ্গে যুক্ত না করে, বগুড়াসহ আশপাশের কয়েকটি জেলা নিয়ে নওগাঁকেই একটি স্বতন্ত্র বিভাগ হিসেবে গড়ে তোলার বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত। এতে নওগাঁকেন্দ্রিক প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা সহজ হবে এবং জেলার দৃশ্যমান উন্নয়নের সুযোগ সৃষ্টি হবে।”
নওগাঁ-৪(মান্দা) আসনের সংসদ সদস্য ডাঃ ইকরামুল বারী টিপু বলেন- রাজশাহী একটি পুরাতন এবং ঐতিহ্যবাহী বিভাগ। যা আমরা ছোট থেকে দেখে আসছি। নওগাঁ জেলাবাসী রাজশাহীর সাথে সম্পর্ক এবং সম্পৃক্ত। রাজশাহী একটি শিক্ষা নগরী। যেখানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী মেডিকেল কলেজ সহ গুরুত্বপূর্ন প্রতিষ্ঠান রয়েছে। বর্তমানে দেখা যাচ্ছে কোন কোন প্রতিষ্ঠানের হেড অফিস রাজশাহী থেকে সরিয়ে বগুড়া নেওয়ার চক্রান্ত চলছে। আমরা এর তীব্র বিরোধিতা করছি।বগুড়ার উন্নয়ন হোক এটা আমরা সবাই চাই।
নওগাঁ জেলা বিএনপির সভাপতি ও জেলা পরিষদের প্রশাসক আবু বক্কর সিদ্দিক নান্নু বলেন, সরকার প্রধান যেটা ভাল মনে করবেন আশা করছি নওগাঁবাসীর জন্য সেটাই ভাল হবে। সকল জেলার প্রতি বর্তমান সরকারের সুদৃষ্টি রয়েছে। নওগাঁ যদি নতুন বিভাগের সাথে যুক্ত হয় অবশ্যই উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যাবে বলে মনে করছি।
নওগাঁ চেম্বার অব কর্মাস এন্ড ইন্ডাষ্ট্রির সাবেক সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বগুড়ার সাথে যুক্ত হতে সহমত পোষণ করছি। এখানে ধান, মসলা, ইক্ষু ও আম গবেষণা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এছাড়া এখানে এয়ারপোর্ট হলে কাঁচামাল রপ্তানি সহজ হবে। এখানে উৎপাদমুখী অনেক কারখানা ও প্রতিষ্ঠান রয়েছে। বগুড়াকে ব্যবসায়িক হাব (অঞ্চল) বলা চলে। যা রাজশাহীতে নেই।
আব্দুল্লাহ আল মাহীদ