তানিয়া আক্তার ফারজানা
মানবসভ্যতার ইতিহাসে এমন কিছু আবিষ্কার রয়েছে, যেগুলো ছাড়া আজকের পৃথিবীকে কল্পনাই করা যায় না। বিদ্যুৎ, চাকা কিংবা ইন্টারনেটের মতোই সেই তালিকায় রয়েছে অক্সিজেন। প্রতিটি শ্বাসে যে গ্যাসটি আমাদের জীবন বাঁচিয়ে রাখে, সেই অক্সিজেনকে প্রথমবারের মতো পরীক্ষাগারে পৃথক করার পেছনে রয়েছে এক অবিশ্বাস্য গল্প। আর সেই গল্পের নায়ক ব্রিটিশ বিজ্ঞানী জোসেফ প্রিস্টলি (Joseph Priestley)। আজ থেকে ২৫২ বছর আগে, ১৭৭৪ সালের ১ আগস্ট, ইংল্যান্ডের এক ছোট্ট গবেষণাগারে প্রিস্টলি এমন একটি পরীক্ষা করেছিলেন, যা পরবর্তীকালে আধুনিক রসায়ন বিজ্ঞানের ভিত্তি পাল্টে দেয়। তখন তিনি হয়তো কল্পনাও করতে পারেননি, তাঁর সেই ছোট্ট পরীক্ষাই একদিন চিকিৎসাবিজ্ঞান, শিল্প, পরিবেশ গবেষণা এবং মহাকাশ প্রযুক্তির নতুন দুয়ার খুলে দেবে।
১৭৩৩ সালের ১৩ মার্চ ইংল্যান্ডের ইয়র্কশায়ারে জন্ম নেওয়া জোসেফ প্রিস্টলি শুধু একজন রসায়নবিদ ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন ধর্মযাজক, শিক্ষাবিদ, দার্শনিক এবং রাজনৈতিক চিন্তাবিদও। বিজ্ঞানকে মানুষের কল্যাণে কাজে লাগানোর বিশ্বাস থেকেই তিনি গ্যাস নিয়ে একের পর এক পরীক্ষা চালিয়ে যেতে থাকেন। জীবদ্দশায় তিনি ১৫০টিরও বেশি বই ও গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন, যা তাঁকে তাঁর সময়ের অন্যতম প্রভাবশালী বিজ্ঞানীতে পরিণত করে। ১৭৭৪ সালের সেই ঐতিহাসিক দিনে প্রিস্টলি একটি বিশেষ রাসায়নিক পদার্থ মারকিউরিক অক্সাইড উত্তপ্ত করেন। কিছুক্ষণ পর একটি বর্ণহীন গ্যাস বেরিয়ে আসে। তিনি সেই গ্যাসের মধ্যে একটি জ্বলন্ত মোমবাতি রাখতেই অবাক হয়ে দেখেন শিখাটি সাধারণ বাতাসের তুলনায় অনেক বেশি উজ্জ্বলভাবে জ্বলছে। এরপর একটি পরীক্ষামূলক ইঁদুরকে সেই গ্যাসের মধ্যে রাখলে সেটিও স্বাভাবিকের চেয়ে দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকে। এই দৃশ্যই তাঁকে বুঝিয়ে দেয়, তিনি সম্পূর্ণ নতুন ধরনের একটি গ্যাসের সন্ধান পেয়েছেন।
তবে সে সময় প্রচলিত ফ্লজিস্টন তত্ত্বে বিশ্বাসী হওয়ায় প্রিস্টলি গ্যাসটির নাম দেন "ডিফ্লজিস্টিকেটেড এয়ার"। কয়েক মাস পর ফরাসি বিজ্ঞানী অঁতোয়ান ল্যাভয়জিয়ে একই পরীক্ষা পুনরায় করে প্রমাণ করেন যে এটি একটি নতুন মৌলিক গ্যাস। তিনিই এর নাম দেন অক্সিজেন এবং ব্যাখ্যা করেন যে শ্বাস-প্রশ্বাস, আগুন জ্বলা এবং বিভিন্ন রাসায়নিক বিক্রিয়ায় এই গ্যাসের অপরিহার্য ভূমিকা রয়েছে। এই ব্যাখ্যাই আধুনিক রসায়ন বিজ্ঞানে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা করে। অক্সিজেন আবিষ্কারই ছিল না প্রিস্টলির একমাত্র সাফল্য। তিনি নাইট্রিক অক্সাইড, নাইট্রাস অক্সাইড (লাফিং গ্যাস), অ্যামোনিয়া, সালফার ডাই-অক্সাইড, হাইড্রোজেন ক্লোরাইড এবং কার্বন মনোক্সাইডসহ একাধিক গ্যাস নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা করেন। পাশাপাশি তিনি কার্বনেটেড পানি বা সোডা ওয়াটার তৈরির প্রাথমিক প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেন, যা পরবর্তীকালে বিশ্বজুড়ে কোমল পানীয় শিল্পের ভিত্তি হয়ে ওঠে।
বিজ্ঞানচর্চার পাশাপাশি প্রিস্টলি ছিলেন মুক্তচিন্তার প্রবক্তা। শিক্ষা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ধর্মীয় সহিষ্ণুতার পক্ষে তিনি সবসময় সোচ্চার ছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে একসময় প্রবল বিরোধিতার মুখে পড়তে হয়। এমনকি ১৭৯১ সালে ক্ষুব্ধ জনতা তাঁর বাড়ি ও গবেষণাগারেও হামলা চালায়। পরে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান এবং সেখানেই ১৮০৪ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন। আজ, দুই শতাব্দীরও বেশি সময় পর দাঁড়িয়ে তাঁর সেই আবিষ্কারের গুরুত্ব আরও স্পষ্ট। হাসপাতালের আইসিইউ থেকে শুরু করে অপারেশন থিয়েটার, শিল্পকারখানা, ইস্পাত উৎপাদন, মহাকাশ গবেষণা, বিমান চলাচল, ডুবুরি অভিযান প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে অক্সিজেন অপরিহার্য। পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের প্রতিটি শ্বাসের সঙ্গে যেন জড়িয়ে আছে সেই ঐতিহাসিক পরীক্ষার স্মৃতি।
বিজ্ঞানীরা মনে করেন, প্রিস্টলির গবেষণা না থাকলে আধুনিক রসায়নের বিকাশ আরও অনেক বছর পিছিয়ে যেতে পারত। তাঁর আবিষ্কার প্রমাণ করে, একটি ছোট্ট পর্যবেক্ষণও কখনো কখনো মানবসভ্যতার ইতিহাস বদলে দিতে পারে। ১ আগস্ট তাই শুধু একটি তারিখ নয়, এটি এমন এক দিনের স্মারক, যেদিন একটি মোমবাতির উজ্জ্বল শিখা বিজ্ঞানকে দেখিয়েছিল নতুন পথ। আর সেই পথ ধরেই মানবসভ্যতা এগিয়ে গেছে চিকিৎসা, প্রযুক্তি ও জ্ঞানের এক নতুন দিগন্তে। আজও জোসেফ প্রিস্টলির নাম উচ্চারিত হয় গভীর শ্রদ্ধায়, কারণ তাঁর হাতে শুরু হয়েছিল এমন এক বৈজ্ঞানিক যাত্রা, যার আলো আজও পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের জীবনে ছড়িয়ে আছে।
তানিয়া আক্তার ফারজানা