তানিয়া আক্তার ফারজানা
তৈরি পোশাক (আরএমজি) শিল্পের প্রবৃদ্ধি ধীর হয়ে আসা, স্থানীয় মূল্য সংযোজন কমে যাওয়া এবং শিক্ষিত তরুণদের বেকারত্ব বাড়তে থাকায় বাংলাদেশের সামনে নতুন অর্থনৈতিক খাত গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। এমন বাস্তবতায় বিশ্বের দ্রুত বিকাশমান সেমিকন্ডাক্টর শিল্প বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে উঠে এসেছে। তবে এই শিল্পে সফল হতে হলে শুধু জনশক্তি বা কম মজুরি যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং সঠিক কৌশল।
এমন মত দিয়েছেন প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও নীতিবিষয়ক গবেষক ড. এম. রোকনুজ্জামান। শুক্রবার দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস-এ প্রকাশিত এক বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধে তিনি এ মন্তব্য করেন। বিশ্বব্যাপী সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৮০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। স্মার্টফোন, কম্পিউটার, গাড়ি, চিকিৎসা যন্ত্রপাতি থেকে শুরু করে সামরিক প্রযুক্তি প্রায় সব আধুনিক প্রযুক্তির মূল ভিত্তি হলো সেমিকন্ডাক্টর বা মাইক্রোচিপ। ফলে এ শিল্পে বিপুল কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুযোগ রয়েছে।
ড. রোকনুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশের বিজ্ঞান ও প্রকৌশল শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে এবং বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি প্রকৌশলীদের দক্ষতাও দেশের জন্য বড় সম্পদ হতে পারে। তবে কেবল দক্ষ জনশক্তি থাকলেই একটি শক্তিশালী সেমিকন্ডাক্টর শিল্প গড়ে তোলা সম্ভব নয়। তিনি উদাহরণ হিসেবে বলেন, ভারতের উচ্চমানের প্রকৌশলী ও আইটি দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও দেশটি এখনও সেমিকন্ডাক্টর শিল্পকে জাতীয় অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তিতে রূপ দিতে পারেনি। অন্যদিকে জাপান ও তাইওয়ান নতুন প্রযুক্তি, উদ্ভাবনী ব্যবসায়িক মডেল এবং সঠিক বাজার কৌশল গ্রহণ করে বিশ্বে সফলতা অর্জন করেছে।
নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশ ১৯৮০-এর দশকেই সেমিকন্ডাক্টর খাতে সীমিতভাবে প্রবেশ করেছিল। পরে কিছু দেশীয় প্রতিষ্ঠান চিপ ডিজাইন সেবায় কাজ শুরু করে এবং বর্তমানে এক হাজারের বেশি প্রকৌশলী এই খাতে কর্মরত। তবে এখন পর্যন্ত এই শিল্পের পরিসর সীমিত এবং এটি বড় আকারে অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারেনি। বিশেষজ্ঞদের মতে, সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এর উচ্চ বিনিয়োগ ব্যয়, উন্নত প্রযুক্তি এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা। বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান আকর্ষণ করাও সহজ নয়, কারণ অনেক দেশ বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিয়ে এসব বিনিয়োগ টানছে।
ড. রোকনুজ্জামান মনে করেন, বাংলাদেশকে অন্য দেশের মডেল অনুকরণ না করে নিজস্ব বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নতুন প্রযুক্তি, উদ্ভাবন এবং ব্যবসায়িক কৌশল খুঁজে বের করতে হবে। তাহলেই সেমিকন্ডাক্টর শিল্প ভবিষ্যতে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের নতুন ইঞ্জিনে পরিণত হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যথাযথ নীতিমালা, গবেষণায় বিনিয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা গেলে আগামী দিনে সেমিকন্ডাক্টর শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হবে।
তানিয়া আক্তার ফারজানা