শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬
হোম অপরাধ অর্থনীতি আইন-আদালত আন্তর্জাতিক খেলাধুলা গণমাধ্যম জাতীয় বিজ্ঞান-প্রযুক্তি বিনোদন রাজনীতি শিক্ষা সারাবাংলা

হ্যারি পটারের স্রষ্টা জে. কে. রাউলিং: সংগ্রাম পেরিয়ে বিশ্বসাহিত্যের কিংবদন্তি

তানিয়া আক্তার ফারজানা তানিয়া আক্তার ফারজানা
শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬, ০৯:৪৪ am
হ্যারি পটারের স্রষ্টা জে. কে. রাউলিং: সংগ্রাম পেরিয়ে বিশ্বসাহিত্যের কিংবদন্তি

তানিয়া আক্তার ফারজানা

বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি পাঠকের কল্পনার জগৎ বদলে দেওয়া নাম জে. কে. রাউলিং। হ্যারি পটার সিরিজের মাধ্যমে তিনি শুধু একজন সফল লেখকই নন, আধুনিক সাহিত্যের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছেন। কিন্তু এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সংগ্রাম, দারিদ্র্য, প্রত্যাখ্যান ও অদম্য অধ্যবসায়ের গল্প। ১৯৬৫ সালের ৩১ জুলাই ইংল্যান্ডের ইয়েট শহরে জন্মগ্রহণ করেন রাউলিং। এক্সেটার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালে কাজ করেন। পরে ইংরেজি শিক্ষক হিসেবে পর্তুগালে যান। ব্যক্তিগত জীবনে বিবাহবিচ্ছেদ ও আর্থিক সংকটের মুখোমুখি হয়ে কন্যাসন্তানকে নিয়ে স্কটল্যান্ডের এডিনবরায় ফিরে আসেন। সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভর করেই তখন দিন কাটছিল তার।এই কঠিন সময়েই একটি ক্যাফেতে বসে তিনি লিখতে শুরু করেন ‘হ্যারি পটার অ্যান্ড দ্য ফিলোসফার্স স্টোন’। বইটি প্রকাশের আগে ১২টি প্রকাশনা সংস্থা পাণ্ডুলিপি ফিরিয়ে দেয়। অবশেষে ১৩তম প্রকাশনা সংস্থা ব্লুমসবারি বইটি প্রকাশে সম্মতি দেয়। ১৯৯৭ সালে বইটি প্রকাশের পরই বদলে যায় রাউলিংয়ের জীবন।

হ্যারি পটার সিরিজের মাধ্যমে বিশ্বসাহিত্যে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেন জে. কে. রাউলিং। হ্যারি পটার একজন অনাথ কিশোর, যে ১১ বছর বয়সে জানতে পারে সে একজন জাদুকর। এরপর সে হগওয়ার্টস স্কুল অব উইচক্রাফট অ্যান্ড উইজার্ড্রিতে ভর্তি হয়। বন্ধু রন উইজলি ও হারমায়োনি গ্রেঞ্জারকে সঙ্গে নিয়ে সে অশুভ জাদুকর লর্ড ভলডেমর্টের বিরুদ্ধে লড়াই করে। ১৯৯৭ থেকে ২০০৭ সালের মধ্যে প্রকাশিত সাতটি বই বিশ্বজুড়ে ৬০ কোটিরও বেশি কপি বিক্রি হয়েছে এবং ৮৫টিরও বেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। বইগুলোর ওপর ভিত্তি করে নির্মিত আটটি চলচ্চিত্রও বিশ্বব্যাপী বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করে। পরে Fantastic Beasts চলচ্চিত্র সিরিজ এবং Harry Potter and the Cursed Child নাটকের মাধ্যমে এই জাদুর জগৎ আরও বিস্তৃত হয়।

হ্যারি পটার সিরিজের অভূতপূর্ব সাফল্যের পরও নিজেকে একটি ধারায় সীমাবদ্ধ রাখেননি জে. কে. রাউলিং। ২০১৩ সালে রবার্ট গ্যালব্রেইথ ছদ্মনামে গোয়েন্দা কাহিনি লেখা শুরু করেন। The Cuckoo's Calling দিয়ে শুরু হওয়া Cormoran Strike সিরিজে সাবেক সেনাসদস্য ও ব্যক্তিগত গোয়েন্দা করমোরান স্ট্রাইক এবং তার সহযোগী রবিন এলাকটের রহস্য উদ্ঘাটনের গল্প তুলে ধরা হয়েছে। পাঠকপ্রিয়তা পাওয়ার পাশাপাশি এই সিরিজ পরে সফল টেলিভিশন ধারাবাহিকেও রূপান্তরিত হয়।

সাহিত্যজগতের সাফল্যের পাশাপাশি সমাজসেবাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছেন জে. কে. রাউলিং। শিশু কল্যাণ, নারী অধিকার, স্বাস্থ্যসেবা এবং মানবিক সহায়তায় তিনি দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন। Lumos, Volant Trust, Anne Rowling Regenerative Neurology Clinic এবং J.K. Rowling Women's Fund-এর মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক উদ্যোগে অবদান রেখে চলেছেন।সাহিত্যিক সাফল্যের পাশাপাশি জে. কে. রাউলিংকে ঘিরে বিতর্কও কম ছিল না। ২০২০ সালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিঙ্গপরিচয়-সংক্রান্ত মন্তব্যের জেরে তিনি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেন। এ ঘটনায় বিশ্বজুড়ে মতভেদ দেখা দেয়। হ্যারি পটার চলচ্চিত্রের কয়েকজন অভিনেতা তাঁর বক্তব্যের সমালোচনা করলেও, অন্যদিকে অনেকে মত প্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্নে তাঁর অবস্থানের প্রতি সমর্থন জানান।

২০২০ সালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিঙ্গপরিচয়-সংক্রান্ত মন্তব্যের পর জে. কে. রাউলিং বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচনায় আসেন। বিষয়টি নিয়ে ভিন্নমত সৃষ্টি হয়। হ্যারি পটার চলচ্চিত্রের কয়েকজন অভিনেতা তাঁর মন্তব্যের সমালোচনা করেন, আবার অনেকেই মত প্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্নে তাঁর অবস্থানের প্রতি সমর্থন জানান। জে. কে. রাউলিং তাঁর বিভিন্ন বক্তৃতা ও লেখায় জীবনের সংগ্রাম, ব্যর্থতা, সাহস এবং আশাবাদ নিয়ে অনেক অনুপ্রেরণামূলক কথা বলেছেন। ”তাঁর বলা উল্লেখযোগ্য কয়েকটি উক্তির মধ্যে রয়েছে”-

“Rock bottom became the solid foundation on which I rebuilt my life.” “জীবনের একেবারে তলানিতে পৌঁছানোই ছিল সেই শক্ত ভিত্তি, যার ওপর আমি নতুন করে জীবন গড়ে তুলেছি।”

“It is impossible to live without failing at something.” “কোনো না কোনো ক্ষেত্রে ব্যর্থ না হয়ে জীবন কাটানো অসম্ভব।”

“We do not need magic to change the world; we carry all the power we need inside ourselves.” “পৃথিবী বদলাতে জাদুর প্রয়োজন নেই; আমাদের ভেতরেই পরিবর্তন আনার সব শক্তি রয়েছে।”

“Happiness can be found even in the darkest of times, if one only remembers to turn on the light.” “অন্ধকারতম সময়েও সুখ খুঁজে পাওয়া যায়, যদি কেউ শুধু আলো জ্বালাতে মনে রাখে।”

জে. কে. রাউলিং শুধু একজন লেখক নন; তিনি এমন একজন স্রষ্টা, যিনি কোটি কোটি মানুষকে বই পড়ার প্রতি আগ্রহী করে তুলেছেন। দারিদ্র্য, প্রত্যাখ্যান ও ব্যক্তিগত সংকটকে জয় করে তিনি প্রমাণ করেছেন অধ্যবসায়, কল্পনাশক্তি এবং কঠোর পরিশ্রম থাকলে অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায়। আজ হ্যারি পটার শুধু একটি বইয়ের নাম নয়, এটি বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়।

Viewer Image
×
লিংক কপি করা হয়েছে!