তানিয়া আক্তার ফারজানা
আফ্রিকার নারীদের অধিকার, সমতা, নেতৃত্ব এবং সমাজ-অর্থনৈতিক উন্নয়নে তাঁদের অসামান্য অবদানকে স্বীকৃতি জানাতে প্রতি বছর ৩১ জুলাই পালিত হয় আফ্রিকান নারী দিবস। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে দিবসটি উপলক্ষে র্যালি, আলোচনা সভা, সেমিনার, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নারী উদ্যোক্তাদের সম্মাননা এবং সচেতনতামূলক নানা কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।
আফ্রিকান নারী দিবসের সূচনা হয় ১৯৬২ সালের ৩১ জুলাই। সেদিন তৎকালীন টাঙ্গানিকার (বর্তমান তানজানিয়া) দার এস সালামে অনুষ্ঠিত প্রথম প্যান-আফ্রিকান নারী সম্মেলনে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের নারী নেত্রীরা একত্রিত হয়ে প্যান-আফ্রিকান নারী সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। একই সম্মেলনে প্রতি বছর ৩১ জুলাই আফ্রিকান নারী দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। পরবর্তীতে এই সংগঠনটি আফ্রিকাজুড়ে নারীর অধিকার, সমতা ও ক্ষমতায়নের অন্যতম প্রধান সংগঠন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
এই দিবসের মূল লক্ষ্য হলো নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় সমান সুযোগ নিশ্চিত করা, অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং শান্তি ও উন্নয়নে নারীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা তুলে ধরা। একই সঙ্গে আফ্রিকার স্বাধীনতা, উন্নয়ন ও সামাজিক অগ্রগতিতে নারীদের অবদানকে সম্মান জানানোও এই দিবসের অন্যতম উদ্দেশ্য।
বর্তমানে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে নারীরা কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, ব্যবসা-বাণিজ্য, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, শিল্প-সংস্কৃতি, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, রাজনীতি এবং সামাজিক নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। কৃষিক্ষেত্রে খাদ্য উৎপাদন, স্বাস্থ্যসেবায় চিকিৎসা প্রদান, শিক্ষা বিস্তার, প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং ব্যবসা পরিচালনায় তাঁদের অবদান আফ্রিকার অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
তবে এই অগ্রগতির পাশাপাশি আফ্রিকার অনেক অঞ্চলে এখনো দারিদ্র্য, লিঙ্গবৈষম্য, শিশুবিবাহ, নারীর প্রতি সহিংসতা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় বৈষম্য এবং কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগের মতো নানা চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। এসব সমস্যা দূর করতে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের সরকার, নারী সংগঠন এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো যৌথভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
আফ্রিকান ইউনিয়ন, জাতিসংঘ এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার মতে, নারীর ক্ষমতায়ন ছাড়া টেকসই উন্নয়ন অর্জন সম্ভব নয়। তাই নারী শিক্ষা, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, উদ্যোক্তা সৃষ্টি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, নেতৃত্বের বিকাশ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
দিবসটি উপলক্ষে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে নারী অধিকার বিষয়ক আলোচনা, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, সম্মাননা প্রদান, তরুণীদের নেতৃত্ব বিকাশ কর্মসূচি এবং সচেতনতামূলক প্রচারণা পরিচালিত হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নারী অধিকার, লিঙ্গসমতা এবং নারীর সাফল্য তুলে ধরে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো দেশের উন্নয়ন তখনই টেকসই ও অর্থবহ হয়, যখন নারী ও পুরুষ সমানভাবে উন্নয়নের অংশীদার হতে পারেন। তাই নারীর অধিকার নিশ্চিত করা শুধু মানবাধিকারের বিষয় নয়, এটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামাজিক স্থিতিশীলতা, শান্তি এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের অন্যতম পূর্বশর্ত। আফ্রিকান নারী দিবস বিশ্ববাসীকে স্মরণ করিয়ে দেয় নারীর জন্য সমান অধিকার, মর্যাদা ও সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে একটি সমাজ, একটি রাষ্ট্র এমনকি একটি মহাদেশও উন্নয়নের নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে। নারীর ক্ষমতায়নই একটি বৈষম্যহীন, শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ নির্মাণের অন্যতম ভিত্তি।
তানিয়া আক্তার ফারজানা