পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার উলানিয়া বন্দরে ঝুম বৃষ্টি ও সড়কের বেজমেন্টে জমে থাকা পানির মধ্যেই আরসিসি (রিজিড পেভমেন্ট) ঢালাই কাজ করার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের বাধা উপেক্ষা করে কাজ চালিয়ে যাওয়ায় এলজিইডির কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এলাকাবাসী। তবে উপজেলা প্রকৌশলীর দাবি, রাস্তার ওপর পানি জমে না থাকলে নির্মাণকাজের গুণগত মানের কোনো সমস্যা হবে না।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) ২০২৪-২৫ অর্থবছরের আওতায় প্রায় দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে ৪৭০ মিটার দৈর্ঘ্য, ৬ দশমিক ৭ মিটার প্রস্থ এবং ৮ ইঞ্চি পুরুত্বের একটি সড়কের আরসিসি ঢালাই কাজ বাস্তবায়ন করছে পটুয়াখালীর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ডালিয়া ট্রেডার্স। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী মো. ফিরোজ মিয়া। মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও দীর্ঘদিন বন্ধ থকার পর বুধবার (২৯ জুলাই) পুনরায় ঢালাই কাজ শুরু হয়।
সরেজমিনে দেখা যায়, ঝুম বৃষ্টির মধ্যেই ঢালাই কাজ চলছিল। সড়কের বেজমেন্টের বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকলেও সেই অবস্থাতেই কংক্রিটের মিশ্রণ ঢালা হচ্ছে। সদ্য ঢালাইকৃত অংশ বৃষ্টির পানি থেকে রক্ষায় শ্রমিকরা পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখার চেষ্টা করেন। কয়েকটি স্থানে বৃষ্টির পানিতে ঢালাইয়ের ওপর পানি জমে কংক্রিট সরে যেতে দেখা যায়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বৃষ্টির মধ্যে এবং জমে থাকা পানির ওপর আরসিসি ঢালাই করলে নির্মাণকাজের স্থায়িত্ব ও গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া নির্ধারিত অনুপাতের তুলনায় বেশি পাথর ও বালু ব্যবহার করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তারা। স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রতি ব্যাচে ৫ টিন (গাবলা) পাথর, ৩ টিন (গাবলা) বালু ও ১ ব্যাগ সিমেন্ট দিয়ে মিশ্রণ তৈরি করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে তারা আপত্তি জানিয়ে বৃষ্টির মধ্যে কাজ বন্ধের অনুরোধ করলেও সংশ্লিষ্টরা তা আমলে নেননি বলে দাবি করেন। দীর্ঘদিন ধরে রাস্তার বেজমেন্ট করে, রডের জালি বেধে রাস্তায় ফেলে রাখা হয়েছিলো। এছাড়াও অভিযোগ রয়েছে বেজমেন্টে ও গাইড ওয়ালে নিম্নমানের ইট সামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে।
স্থানীয় ইউপি সদস্য মাসুম মিয়া বলেন, “বৃষ্টির মধ্যে এভাবে ঢালাই করলে রাস্তার মান নিয়ে মানুষের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হয়। কোথাও কাজ-সংক্রান্ত তথ্যসম্বলিত সাইনবোর্ডও নেই। আমরা সাধারণ মানুষ হিসেবে প্রকল্পের বরাদ্দ ও তথ্য জানার অধিকার রাখি। কাজটি যেন সঠিকভাবে হয়, সেটিই আমাদের প্রত্যাশা।”
স্থানীয় ব্যবসায়ী মনির মিয়া বলেন, “সরকার কোটি কোটি টাকা ব্যয় করছে। কিন্তু কাজ যদি নিয়ম মেনে না হয়, তাহলে কয়েক বছরের মধ্যেই রাস্তা নষ্ট হয়ে যাবে। আমরা বৃষ্টির মধ্যে কাজ বন্ধ করতে বললেও তারা শোনেননি। ঢালাইয়ে পাথর, বালু ও সিমেন্টের অনুপাতও ঠিকভাবে মানা হয়নি।”
অভিযোগের বিষয়ে জানতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দ্বায়িত্বে থাকা প্রতিনিধি মো. মালেক কে একাধিকবার ফোন দিলেও কোন সাড়া পাওয়া যায়নি।
কাজের তদারকির দায়িত্বে থাকা উপ-সহকারী প্রকৌশলী রিপন দাস বলেন, “পানি উন্নয়ন বোর্ডের অনাপত্তিপত্র (এনওসি) পেতে দীর্ঘ সময় লাগায় নির্ধারিত সময়ে কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। পরে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে কাজ শুরু হলেও বিভিন্ন কারণে কিছুদিন বন্ধ ছিল। এখন আবার ঢালাই কাজ চলছে। সব উপকরণ নির্ধারিত পরিমাণেই ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে আমার নজরের বাইরে দুই-একটি ব্যাচে কিছুটা তারতম্য হয়ে থাকতে পারে। আর বৃষ্টির মধ্যে কাজ করলেও গুণগত মান নষ্ট হবে না। জমে থাকা পানি সরিয়েই ঢালাই করা হয়েছে।”
এ বিষয়ে গলাচিপা উপজেলা প্রকৌশলী মো. হাবিবুর রহমান বলেন, “বৃষ্টির কারণে যদি রাস্তার ওপর পানি জমে না থাকে, তাহলে গুণগত মানের কোনো সমস্যা হবে না। ঢালাইয়ে নির্ধারিত অনুপাতে উপকরণ ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, আমি দেখি নাই, তদারকির দায়িত্বে সাব অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার ও ওয়ার্ক অ্যাসিস্ট্যান্ট ছিলেন। তারা এ বিষয়ে বিস্তারিত বলতে পারবেন।” তিনি আরও বলেন, বৃষ্টি হলে কাজ বন্ধ রাখা হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবুজর মো. ইজাজুল হক বলেন, “বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। আমি উপজেলা প্রকৌশলীর সঙ্গে কথা বলছি। পাশাপাশি ঘটনাস্থলে সরেজমিনে গিয়ে কাজের অবস্থা ও অভিযোগের বিষয়ে খোঁজখবর নেব। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
এ ঘটনায় স্থানীয়রা নির্মাণকাজের গুণগত মান নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের তদন্ত, নিবিড় তদারকি এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
মোঃ সুমন খান.মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার. গলাচিপা