টঙ্গী, গাজীপুর প্রতিনিধি-
তানিয়া আক্তার ফারজানা
দেশের বাজারে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সুগন্ধি চালের দাম ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন খুচরা বাজারে প্রতি কেজি সুগন্ধি চাল বিক্রি হচ্ছে ২২০ থেকে ২৩০ টাকায়। মাত্র চার মাসের ব্যবধানে এই চালের দাম বেড়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ, যা সাধারণ ভোক্তাদের জন্য নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও বিশ্লেষকদের মতে, সুগন্ধি চাল রপ্তানির অনুমোদন বৃদ্ধি এবং দেশের বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়াই মূল্যবৃদ্ধির প্রধান কারণ। বিশেষ করে চিনি গুঁড়া ও কালিজিরা জাতের চালের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় বাজারে সংকট আরও প্রকট হয়েছে।
রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, খোলা চিনি গুঁড়া চাল প্রতি কেজি ২২০ থেকে ২৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কয়েক সপ্তাহ আগেও একই চালের দাম ছিল ১৮০ থেকে ১৯০ টাকা। আর চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে এর দাম ছিল মাত্র ১৩৫ থেকে ১৪০ টাকা। একইভাবে প্যাকেটজাত সুগন্ধি চাল বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১৯০ টাকা কেজি দরে, যা কয়েক মাস আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। মোহাম্মদপুরের এক মুদি ব্যবসায়ী জানান, সরকার বেসরকারি খাতে সুগন্ধি চাল রপ্তানির অনুমতি দেওয়ার পর থেকেই বাজারে দাম বাড়তে শুরু করে। রমজানকে সামনে রেখে নেওয়া সেই সিদ্ধান্তের পর থেকে ধাপে ধাপে মূল্যবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে প্রায় দুই বছরের নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে ১৩৩টি প্রতিষ্ঠানকে ২৫ হাজার টন সুগন্ধি চাল রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হয়। পরে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আবারও রপ্তানির অনুমোদন দেওয়া হয়। সর্বশেষ মে মাসে ২১১টি প্রতিষ্ঠানকে ৩৬ হাজার ৫২০ টন সুগন্ধি চাল চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত রপ্তানির অনুমতি দেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। চাল ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, দেশের সুগন্ধি চালের বাজারের বড় একটি অংশ কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। একই প্রতিষ্ঠানগুলো দেশীয় বাজারে বিক্রির পাশাপাশি রপ্তানিও করছে। ফলে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অতিরিক্ত মুনাফা অর্জনের সুযোগ তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
বাংলাদেশ রাইস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ ইসহাকুল হোসেন অবশ্য দাবি করেছেন, গত এক মাসে রপ্তানির পরিমাণ ছিল মাত্র দুই হাজার থেকে দুই হাজার একশ টন, যা দেশের মোট উৎপাদনের তুলনায় খুবই সামান্য। তবে অনেক বড় মিলার রপ্তানির ঘোষণাকে কেন্দ্র করে চাল মজুত রেখে বাজারে উচ্চমূল্য বজায় রাখার চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। কৃষি অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক গোলাম হাফিজ কেনেডি বলেন, চলতি মৌসুমে বোরো ও আউশ ধানের উৎপাদনে কিছুটা ঘাটতি দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারেও সুগন্ধি চালের দাম বেড়েছে। এ অবস্থায় বড় পরিসরে সুগন্ধি চাল রপ্তানি দেশের জন্য সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বাংলাদেশ কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশনের (ক্যাব) সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবির ভূঁইয়া বলেন, কয়েকটি ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর বাজার নিয়ন্ত্রণের কারণেই সাধারণ ভোক্তাদের অতিরিক্ত মূল্য গুনতে হচ্ছে। দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনে সুগন্ধি চাল রপ্তানি সাময়িকভাবে স্থগিত করার আহ্বান জানান তিনি। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বছরে ৪ কোটির বেশি টন ধান উৎপাদিত হলেও সুগন্ধি চালের উৎপাদন মাত্র ১২ থেকে ১৫ লাখ টন। দেশের বার্ষিক চাহিদা ৭ থেকে ৮ লাখ টন। উৎপাদন ও চাহিদার এই ভারসাম্য বজায় রাখতে কার্যকর বাজার তদারকি এবং সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
তানিয়া আক্তার ফারজানা