বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬
হোম অপরাধ অর্থনীতি আইন-আদালত আন্তর্জাতিক খেলাধুলা গণমাধ্যম জাতীয় বিজ্ঞান-প্রযুক্তি বিনোদন রাজনীতি শিক্ষা সারাবাংলা

দীঘিনালা বন বিহারে আষাঢ়ী পুর্মিণা উদযাপন

উপজেলা প্রতিনিধি উপজেলা প্রতিনিধি
বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ১২:২৪ pm
২৯
দীঘিনালা বন বিহারে আষাঢ়ী পুর্মিণা উদযাপন

রুপম চাকমা দিঘীনালা

আজ আষাঢ়ী পূর্ণিমা, বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের পরম পবিত্র ও পুণ্যময় তিথি
বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব পবিত্র আষাঢ়ী পূর্ণিমা।

বুধবার (২৯ জুলাই) খাগড়াছড়ি দীঘিনালা বন বিহারে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে আষাঢ়ী পুর্ণিমা উদযাপন হয়েছে।

সকাল ৯টায় দীঘিনালা বন বিহারের আজীবন বিহার অধ্যক্ষ শ্রদ্ধেয় নন্দপাল মহাস্হবির ভান্তে মংঘর শুভ উদ্ধোধনের মধ্য ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। শুরুতে পঞ্চশীল গ্রহন, বুদ্ধমুর্তি দান, সংঘদান, অষ্টপরিস্কার দান, ও বৌদ্ধ ভিক্ষুদের বর্সা বাসের চীবর দান করা হয়।   আজ থেকে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা তিন মাস বর্সাবাস পালন করবেন, তিন মাস বর্সাবাস শেষে এর পর শুরু হবে এক মাস ব্যাপি দানোতম মহান কঠিন চীবর দান অনুষ্টান।

বৌদ্ধ শাস্ত্র মতে, আষাঢ়ী পূর্ণিমা এমন একটি মহিমান্বিত তিথি, যার সাথে মহামানব সিদ্ধার্থ গৌতম তথা তথাগত সম্যক সম্বুদ্ধের জীবনের পাঁচটি ঐতিহাসিক ঘটনার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। এই পূর্ণিমাতেই তিনি মাতৃগর্ভে প্রতিসন্ধি গ্রহণ করেন, সংসারের মায়া ত্যাগ করে মহাভিনিষ্ক্রমণ বা গৃহত্যাগ করেন, বুদ্ধত্ব লাভের পর প্রথমবারের মতো ধর্মচক্র প্রবর্তন সূত্র দেশনা করেন, অলৌকিক প্রাতিহার্য ঋদ্ধি প্রদর্শন করেন এবং তাবতিংস স্বর্গে গমন করে প্রয়াত জননী রানী মহামায়াকে অভিধর্ম দেশনা প্রদান করেন। এসব ঘটনার কারণেই আষাঢ়ী পূর্ণিমা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কাছে অসীম শ্রদ্ধা, ভক্তি ও পুণ্য অর্জনের দিন হিসেবে বিবেচিত।

বৌদ্ধ ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, মহাপুরুষেরা নির্দিষ্ট সময়, উপযুক্ত পরিবার ও অনুকূল পরিবেশে জন্মগ্রহণ করেন। সেই ধারাবাহিকতায় রাজা শুদ্ধোধন ও রানী মহামায়ার গর্ভে জন্ম নেওয়ার পূর্বে আষাঢ়ী পূর্ণিমা তিথিতে সিদ্ধার্থ গৌতম প্রতিসন্ধি গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে জন্ম, জরা, ব্যাধি, মৃত্যু এবং সন্ন্যাসী—এই চারটি মহা নিমিত্ত দর্শন করে মানবজীবনের দুঃখের কারণ অনুসন্ধানে তিনি একই পূর্ণিমা তিথিতে রাজপ্রাসাদের সকল ভোগ-বিলাস ত্যাগ করে গৃহত্যাগ করেন।

গৃহত্যাগের পর দীর্ঘ ছয় বছর কঠোর তপস্যা, ধ্যান ও আত্মসংযমের মাধ্যমে তিনি সম্যক সম্বুদ্ধত্ব লাভ করেন। এরপর আষাঢ়ী পূর্ণিমা তিথিতে ভারতের সারনাথের ঋষিপতন মৃগদাবে পাঁচজন প্রাক্তন সঙ্গীকে উদ্দেশ্য করে প্রথম ধর্মদেশনা প্রদান করেন, যা বৌদ্ধ ধর্মে ধর্মচক্র প্রবর্তন সূত্র নামে পরিচিত। এই ধর্মদেশনার মাধ্যমেই বিশ্বের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বৌদ্ধ ধর্মের আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু হয় এবং প্রতিষ্ঠিত হয় বৌদ্ধ সংঘের ভিত্তি।

ধর্মীয় ইতিহাসে আরও উল্লেখযোগ্য যে, মাতা রানী মহামায়ার মৃত্যুর পর গৌতম বুদ্ধ তাবতিংস স্বর্গে গমন করে তাকে অভিধর্ম দেশনা করেন। একই সাথে আষাঢ়ী পূর্ণিমাতেই তিনি ভিক্ষু সংঘের জন্য তিন মাসব্যাপী বর্ষাব্রত বা বর্ষাবাস পালনের নিয়ম প্রবর্তন করেন, যা আজও বিশ্বের সব বৌদ্ধ সংঘে যথাযথ মর্যাদায় পালিত হয়ে আসছে।

বৌদ্ধ ধর্মে উপোসথ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় অনুশাসন। 'উপবসত' শব্দ থেকেই 'উপোসথ' শব্দের উৎপত্তি। এর অর্থ ধর্মের নিকটে অবস্থান করা, আত্মসংযম চর্চা করা এবং ধর্মীয় জীবনকে শুদ্ধ ও পরিশীলিত করে তোলা। আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে প্রবারণা পূর্ণিমা পর্যন্ত সময়ে ধর্মপ্রাণ বৌদ্ধরা উপোসথ পালন, দান, শীল গ্রহণ এবং ভাবনার মাধ্যমে নিজেদের আত্মিক উন্নয়ন সাধনের চেষ্টা করেন।

উপোসথ পালনকারীরা অষ্টশীল অনুসরণ করেন। এর মধ্যে রয়েছে—প্রাণী হত্যা থেকে বিরত থাকা, চুরি না করা, মিথ্যা কথা না বলা, মাদকদ্রব্য গ্রহণ না করা, ব্রহ্মচর্য পালন, বিকালের পর আহার না করা, অলংকার ও সুগন্ধি ব্যবহার থেকে বিরত থাকা এবং বিলাসবহুল শয্যা পরিহার করা। বৌদ্ধ ধর্মমতে, এসব অনুশীলন মানুষের আত্মশুদ্ধি, চিত্তের প্রশান্তি, নৈতিকতা ও প্রজ্ঞা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

আষাঢ়ী পূর্ণিমার সাথে বর্ষাবাসের সম্পর্কও অত্যন্ত গভীর। বুদ্ধের সময় ভিক্ষুরা বছরের সব সময় ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ভ্রমণ করতেন। কিন্তু বর্ষাকালে চলাচলের ফলে ক্ষেতের ফসল, সবুজ ঘাস, ছোট ছোট প্রাণী ও পরিবেশের ক্ষতি হতো। এছাড়া বৃষ্টিতে ভিক্ষুদের চীবর ভিজে যেত এবং চলাচলে নানা ধরনের অসুবিধার সৃষ্টি হতো। এসব বিষয় বিবেচনায় এনে গৌতম বুদ্ধ আষাঢ়ী পূর্ণিমার দিন থেকেই ভিক্ষুদের জন্য তিন মাসব্যাপী বর্ষাব্রত পালনের বিধান চালু করেন।

বর্ষাবাসের এই তিন মাস ভিক্ষুরা নির্দিষ্ট বিহারে অবস্থান করে ধ্যান, সাধনা, শাস্ত্র অধ্যয়ন এবং আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে নিজেদের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক উন্নয়ন ঘটান। একই সাথে সাধারণ গৃহীরাও এই সময়ে দান, শীল, ভাবনা ও ধর্মচর্চায় অধিক মনোযোগী হন। বর্ষাব্রত শেষে প্রবারণা পূর্ণিমা এবং পরবর্তীতে কঠিন চীবর দান অনুষ্ঠান পালনের মধ্য দিয়ে ধর্মীয় কর্মসূচির ধারাবাহিকতা সম্পন্ন হয়।

বৌদ্ধ ঐতিহ্যে আরও বিশ্বাস করা হয়, গৃহত্যাগের সময় সিদ্ধার্থ গৌতম নিজের কেশ কেটে আকাশে নিক্ষেপ করলে দেবতারা তা গ্রহণ করে স্বর্গে চৈত্য নির্মাণ করেন। সেই স্মৃতিকে ধারণ করে বর্ষাবাস শেষে অনেক স্থানে আকাশ প্রদীপ বা ফানুস উত্তোলনের মাধ্যমে বিশ্বমানবের সুখ, শান্তি ও কল্যাণ কামনা করা হয়।

অনুষ্টানে শ্রদ্ধেয় নন্দপাল মহাস্হবির ভান্তে বলেন ধর্মীয় গুরু বলেন, ‘আষাঢ়ী পূর্ণিমা কেবল একটি উৎসব নয়; এটি আত্মসংযম, করুণা, মৈত্রী, প্রজ্ঞা, অহিংসা ও মানবকল্যাণের শিক্ষা ধারণ করার একটি অনন্য উপলক্ষ। এই পবিত্র তিথির মূল শিক্ষা ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রজীবনে শান্তি, সহমর্মিতা এবং নৈতিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় অনুপ্রেরণা জোগায়।’

পবিত্র আষাঢ়ী পূর্ণিমার এই শুভক্ষণে বৌদ্ধ সমাজসহ সকল ধর্মের মানুষের প্রত্যাশা— জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক, বাংলাদেশ আরও সমৃদ্ধ হোক এবং অশান্ত বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত হোক শান্তি, সম্প্রীতি ও মানবতার জয়গান।

Viewer Image
×
লিংক কপি করা হয়েছে!