রাজধানীর ডেমরা থানা ও নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ থানার বিভিন্ন এলাকায় মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, জমি দখল, ছিনতাই ও ডাকাতিসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে মোহাম্মদ আশিক ওরফে ‘কিলার আশিক’-এর বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের অভিযোগ, উঠতি বয়সী কিশোর ও যুবকদের নিয়ে একটি সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র গড়ে তুলেছেন তিনি। তাঁর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে মাদক ব্যবসার একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট।
সরেজমিনে ডেমরা ও সিদ্ধিরগঞ্জ থানার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ডেমরা-সাইনবোর্ডের গ্রিন সিটি, বোর্ডমিল ও সানারপাড়ের লন্ডন মার্কেট এলাকায় ইয়াবা ব্যবসার অন্যতম ডিলার হিসেবে পরিচিত আশিক। অভিযোগ রয়েছে, টেকনাফ থেকে চট্টগ্রাম হয়ে আসা ইয়াবার চালান সরাসরি লন্ডন মার্কেট এলাকায় তাঁর কাছে পৌঁছায়। পরে সেখান থেকে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় নিজস্ব ডিলারদের মাধ্যমে এসব মাদক ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
স্থানীয় একাধিক ব্যক্তির দাবি, গত ৫ আগস্ট যাত্রাবাড়ী থানায় হামলা ও লুটপাটের সময় খোয়া যাওয়া কিছু আগ্নেয়াস্ত্র এবং পুলিশের গ্রেনেড আশিক ও তাঁর সহযোগীদের কাছে রয়েছে। তাঁদের দাবি, আশিকের বাহিনীর কাছে আট থেকে দশটি পিস্তলসহ বিভিন্ন ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে। এসব অস্ত্র ব্যবহার করে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে ছিনতাই, ডাকাতি ও অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, আশিকের রয়েছে ৩০ থেকে ৪০ জনের একটি সংঘবদ্ধ বাহিনী। এই বাহিনীর সদস্যরা বিভিন্ন এলাকায় ছিনতাই ও ডাকাতির মতো অপরাধে জড়িত থেকে অর্জিত অর্থ নিয়মিত আশিকের কাছে পৌঁছে দেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, পলাতক নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাদের কাছ থেকে অর্থের বিনিময়ে বিভিন্ন মিছিল-মিটিংয়ে লোক সরবরাহ করেন আশিক। তাঁর বাহিনীর সদস্যরা ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের হয়ে ককটেল হামলাসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছেন বলেও অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
সম্প্রতি সাইনবোর্ড এলাকার গ্রিন সিটিতে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের একটি মিটিং চলাকালে সংবাদ সংগ্রহ করতে যান কয়েকজন সাংবাদিক। এ সময় আশিক তাঁর সহযোগীদের নিয়ে সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালান বলে অভিযোগ উঠেছে।
সাংবাদিকদের অভিযোগ, হামলার সময় তাঁদের একটি ক্যামেরা, দুটি মোবাইল ফোন, মানিব্যাগ এবং মানিব্যাগে থাকা নগদ টাকা লুট করে নিয়ে যায় হামলাকারীরা। এ ঘটনায় সাংবাদিকরা ডেমরা থানায় একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করেছেন বলে জানা গেছে। তবে মামলা দায়েরের পরও অভিযুক্ত আশিককে গ্রেপ্তার করা হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন তাঁরা।
এলাকার একাধিক বাসিন্দার অভিযোগ, অর্থের বিনিময়ে জমি দখল, ইয়াবা ও গাঁজার ব্যবসা এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে ছিনতাই ও ডাকাতিসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত আশিক ও তাঁর সহযোগীরা।
ভয়ে অনেকেই তাঁর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না। স্থানীয়দের দাবি, কেউ তাঁর বিরুদ্ধে কথা বললে তাঁকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। এমনকি ভুক্তভোগীদের বাড়িঘর লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণের অভিযোগও রয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, গত ৫ আগস্ট যাত্রাবাড়ী থানা থেকে লুট হওয়া বেশ কিছু অস্ত্র এখনো আশিকের কাছে রয়েছে বলে তাঁরা আশঙ্কা করছেন। তাঁদের দাবি, এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করে দ্রুত আশিক ও তাঁর সহযোগীদের আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে বক্তব্য জানতে মোহাম্মদ আশিক ওরফে কিলার আশিকের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করেন এই প্রতিবেদক। এ সময় তাঁর বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করা হলে গুলি করে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন প্রতিবেদক।
এ ঘটনায় সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
প্রশাসনের হস্তক্ষেপ ও দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি
ডেমরা ও সিদ্ধিরগঞ্জের বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, মাদক সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অভিযান এবং অভিযুক্তদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।
স্থানীয়দের প্রশ্ন—এত গুরুতর অভিযোগের পরও কীভাবে প্রকাশ্যে নিজের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন অভিযুক্ত আশিক? তাঁর কথিত অপরাধী বাহিনীর সদস্যরা কারা? মাদক ও অবৈধ অস্ত্রের এই নেটওয়ার্কের পেছনে আর কারা জড়িত?
এখন দেখার বিষয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এসব অভিযোগের ভিত্তিতে কী পদক্ষেপ গ্রহণ করে এবং কথিত এই অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে কবে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়।